Chander Pahar Part-3
চাঁদের পাহাড়
সাহিত্য হল সমাজের দর্পণ । সমাজ জীবনের টুকরো টুকরো তথ্যকে লিখনী নামক সুতোয় গেঁথে পাঠকের কাছে পৌঁছে পৌঁছে দেয় সাহিত্য কর্ম । সাহিত্য কাঁদাতে পারে, পারে হাসাতে আবার সাহিত্য পাঠের মাধ্যমেই ভাষাগত জ্ঞান পূর্ণতা পায় । বাংলার সাহিত্যের আনাচে-কানাচে পড়ে রয়েছে সাহিত্যরুপি অনেক মণি-মুক্ত । অনেক স্রষ্টার অনেক সৃষ্টি । আমাদের লক্ষ্য সেই সমস্ত মণি-মানিক্যের সম্ভারকে পাঠকের কাছে তুলে ধরা । স্রষ্টার সৃষ্টি ও আধুনিক সময়ের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে পাঠককে উৎসাহিত করে সাহিত্য পাঠে আগ্রহী করে তোলা । সেই উদ্দেশ্যেই বৈঠকি সাহিত্য বিভাগে এখন থাকছে Chander Pahar [চাঁদের পাহাড়] ।
চাঁদের পাহাড়
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়
[৩]
নতুন পদ পেয়ে উৎফুল্ল মনে শঙ্কর যখন স্টেশনটাতে এসে নামল, তখন বেলা তিনটে হবে। স্টেশনঘরটা খুব ছোট। মাটির প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্ম আর স্টেশনঘরের আশপাশ কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। স্টেশনঘরের পেছনে তার থাকবার কোয়ার্টার। পায়রার খোপের মতো ছোট। যে ট্রেনখানা তাকে বহন করে এনেছিল, সেখানা কিসুমুর দিকে চলে গেল। শঙ্কর যেন অকূল সমুদ্রে পড়ল। এত নির্জন স্থান সে জীবনে কখনো কল্পনা করেনি।
এই স্টেশনে সে-ই একমাত্র কর্মচারী। একটা কুলি পর্যন্ত নেই। সে-ই কুলি, সে-ই পয়েন্টসম্যান, সে-ই সব।
এ রকম ব্যবস্থার কারণ হচ্চে এই যে, এসব স্টেশন এখনো মোটেই আয়কর নয়। এর অস্তিত্ব এখনো পরীক্ষা-সাপেক্ষ। এদের পেছনে রেল-কোম্পানি বেশি খরচ করতে রাজী নয়। একখানি ট্রেন সকালে, একখানি এই গেল-আর সারা দিন-রাত ট্রেন নেই।
সুতরাং তার হাতে প্রচুর অবসর আছে। চার্জ বুঝে নিতে হবে এই যা কাজ। আগের স্টেশনমাস্টারটি গুজরাটি, বেশ ইংরাজি জানে। সে নিজের হাতে চা করে নিয়ে এল। চার্জ বোঝাবার বেশি কিছু নেই। গুজরাটি ভদ্রলোক তাকে পেয়ে খুব খুশি। ভাবে বোধ হল সে কথা বলবার সঙ্গী পায়নি অনেকদিন। দুজনে প্ল্যাটফর্মের এদিক-ওদিক পায়চারি করলে।
শঙ্কর বললে-কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা কেন?
গুজরাতি ভদ্রলোকটি বললে-এ কিছু নয়। নির্জন জায়গা-তাই।
শঙ্করের মনে হল কি একটা কথা লোকটা গোপন করে গেল। শঙ্করও আর পীড়াপীড়ি করলে না। রাত্রে ভদ্রলোক রুটি গড়ে শঙ্করের খাবার নিয়ন্ত্রণ করলে। খেতে বসে হঠাৎ লোকটি চেঁচিয়ে উঠল-ঐ যাঃ, ভুলে গিয়েছি।
-কি হল?
-খাবার জল নেই মোটে, ট্রেন থেকে নিতে একদম ভুলে গিয়েছি।
-সে কি? এখানে খাবার জল কোথাও পাওয়া যায় না?
-কোথাও না। একটা কুয়ো আছে, তার জল বেজায় তেতো আর কষা।
সে জলে বাসন মাজা ছাড়া আর কোনো কাজ হয় না। খাবার জল ট্রেন থেকে দিয়ে যায়।
বেশ জায়গা বটে। খাবার জল নেই, মানুষ জন নেই। এখানে স্টেশন করেছে কেন শঙ্কর বুঝতে পারলে না।
পরদিন সকালে ভূতপূর্ব স্টেশনমাস্টার চলে গেল। শঙ্কর পড়ল একা। নিজের কাজ করে, রাঁধে খায়, ট্রেনের সময় প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ায়। দুপুরে বই পড়ে কি বড় টেবিলটাতে শুয়ে ঘুমোয়। বিকেলের দিকে ছায়া পড়লে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করে।
স্টেশনের চারধার ঘিরে ধূ-ধূ সীমাহীন প্রান্তর, দীর্ঘ ঘাসের বন, মাঝে ইউকা, বাবলা গাছ-দূরে পাহাড়ের সারি সারা চক্রবাল জুড়ে। ভারি সুন্দর দৃশ্য।
গুজরাটি লোকটি ওকে বারণ করে গিয়েছিল-একা যেন এই সব মাঠে সে না বেড়াতে বার হয়।
শঙ্কর বলেছিল-কেন?
সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর গুজরাটি ভদ্রলোকটির কাছ থেকে পাওয়া যায়নি! কিন্তু তার উত্তর অন্য দিক থেকে সে রাত্রেই মিলল।
রাত বেশি না হতেই আহারাদি সেরে শঙ্কর স্টেশনঘরে বাতি জ্বালিয়ে বসে ডায়েরি লিখছে-স্টেশনঘরেই সে শোবে। সামনের কাচ-বসানো দরজাটি বন্ধ আছে কিন্তু আগল দেওয়া নেই, কিসের শব্দ শুনে সে দরজার দিকে চেয়ে দেখে দরজার ঠিক বাইরে কাচে নাক লাগিয়ে প্রকাণ্ড সিংহ! শঙ্কর কাঠের মতো বসে রইল। দরজা একটু জোর করে ঠেললেই খুলে যাবে। সেও সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। টেবিলের উপর কেবল কাঠের রুলটা মাত্র আছে।
সিংহটা কিন্তু কৌতুকের সঙ্গে শঙ্কর ও টেবিলের কেরোসিন বাতিটার দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। খুব বেশিক্ষণ ছিল না, হয়তো মিনিট দুই, কিন্তু শঙ্করের মনে হল সে আর সিংহটা কতকাল ধরে পরস্পর পরস্পরের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর সিংহ ধীরে-ধীরে অনাসক্ত ভাবে দরজা থেকে সরে গেল। শঙ্কর হঠাৎ যেন চেতনা ফিরে পেল। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজার আগলটা তুলে দিলে।
এতক্ষণে সে বুঝতে পারলে স্টেশনের চারিদিকে কাঁটাতারের বেড়া কেন।
কিন্তু শঙ্কর একটু ভুল করেছিল-সে আংশিক ভাবে বুঝেছিল মাত্র, বাকি উত্তরটা পেতে দু-একদিন বিলম্ব ছিল।
সেটা এল অন্য দিক থেকে।
পরদিন সকালের ট্রেনের গার্ডকে সে রাত্রের ঘটনা বললে। গার্ড লোকটি ভালো, সব শুনে বললে-এসব অঞ্চলে সর্বত্রই এমন অবস্থা। এখান থেকে বারো মাইল দূরে তোমার মতো আর একটা ছোট স্টেশন আছে-সেখানেও এই দশা। এখানে তো যে কাণ্ড-
সে কি একটা কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ কথা বন্ধ করে ট্রেনে উঠে পড়ল। যাবার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে বলে গেল-বেশ সাবধানে থেকো সবর্দা!
শঙ্কর চিন্তিত হয়ে পড়ল, এরা কী কথাটা চাপা দিতে চায়? সিংহ ছাড়া আরও কিছু আছে নাকি? যাহোক, সেদিন থেকে শঙ্কর প্ল্যাটফর্মে স্টেশনঘরের সামনে রোজ আগুন জ্বালিয়ে রাখে। সন্ধ্যার আগেই দরজা বন্ধ করে স্টেশনঘরে ঢোকে অনেক রাত পর্যন্ত বসে পড়াশুনা করে বা ডায়েরি লেখে। রাত্রের অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। বিস্তৃত প্রান্তরে ঘন অন্ধকার নামে, প্ল্যাটফর্মের ইউকা গাছটার ডালপালার মধ্যে দিয়ে রাত্রির বাতাস বেধে কেমন একটা শব্দ হয়, মাঠের মধ্যে প্রহরে-প্রহরে শেয়াল ডাকে, এক-একদিন গভীর রাতে দূরে কোথায় সিংহের গর্জন শুনতে পাওয়া যায়-অদ্ভুত জীবন।
ঠিক এই জীবনই সে চেয়েছিল। তার রক্তে আছে। এই জনহীন প্রান্তর, এই রহস্যময়ী রাত্রি, অচেনা নক্ষত্রে ভরা আকাশ, এই বিপদের আশঙ্কা-এই তো জীবন। নিরাপদ শান্ত জীবন নিরীহ কেরানির হতে পারে-তার নয়।
সেদিন বিকেলের ট্রেন রওনা করে দিয়ে সে নিজের কোয়ার্টারের রান্নাঘরে ঢুকতে যাচ্ছে এমন সময়ে খুঁটির গায়ে কী একটা দেখে সে তিন হাত লাফ দিয়ে পিছিয়ে এল-প্রকাণ্ড একটা হলদে খড়িশ গোখুরা তাকে দেখে ফণা উদ্যত করে খুঁটি থেকে প্রায় এক হাত বাইরে মুখ বাড়িয়েছে! আর দু সেকেণ্ড পরে যদি শঙ্করের চোখ সেদিকে পড়ত-তাহলে-না, এখন সাপটাকে মারবার কি করা যায়? কিন্তু সাপটা পরমুহূর্তে খুঁটি বেয়ে ওপরে খড়ের চালের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। বেশ কাণ্ড বটে। ঐ ঘরে গিয়ে শঙ্করকে এখন ভাত রাঁধতে বসতে হবে। এ সিংহ নয় যে দরজা বন্ধ করে আগুন জ্বেলে রাখবে। খানিকটা ইতস্তত করে শঙ্কর অগত্যা রান্নাঘরে ঢুকল এবং কোনোরকমে তাড়াতাড়ি রান্না সেরে সন্ধ্যা হবার আগেই খাওয়া-দাওয়া সাঙ্গ করে সেখান থেকে বেরিয়ে স্টেশনঘরে এল। কিন্তু স্টেশনঘরেই বা বিশ্বাস কি? সাপ কখন কোন ফাঁক দিয়ে ঢুকবে, তাকে কি আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে?
পরদিন সকালের ট্রেনে গার্ডের গাড়ি থেকে একটা নতুন কুলি তার রসদের বস্তা নামিয়ে দিতে এল। সপ্তাহে দুদিন মোম্বাসা থেকে চাল আর আলু রেল-কোম্পানি এই সব নির্জন স্টেশনের কর্মচারীদের পাঠিয়ে দেয়-মাসিক বেতন থেকে এর দাম কেটে নেওয়া হয়।
যে কুলিটা রসদের বস্তা নামিয়ে দিতে এল সে ভারতীয়, গুজরাট অঞ্চলে বাড়ি। বস্তাটা নামিয়ে সে কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে চাইল শঙ্করের দিকে, এবং পাছে শঙ্কর তাকে কিছু জিগগেস করে, এই ভয়েই যেন তাড়াতাড়ি গাড়িতে গিয়ে উঠে পড়ল।
কুলির সে দৃষ্টি শঙ্করের চোখ এড়ায়নি। কী রহস্য জড়িত আছে যেন এই জায়গাটায় সঙ্গে, কেউ তা ওর কাছে প্রকাশ করতে চায় না। প্রকাশ করা যেন বারণ আছে। ব্যাপার কী?
দিন দুই পরে ট্রেন পাশ করে সে নিজের কোয়ার্টারে ঢুকতে যাচ্ছে-আর একটু হলে সাপের ঘাড়ে পা দিয়েছিল আর কি! সেই খড়িশ গোখুরা সাপ। পূর্বদৃষ্ট সাপটাও হতে পারে, নতুন একটা যে নয় তারও কোনো প্রমাণ নেই।
শঙ্কর সেই দিন স্টেশনঘর, নিজের কোয়ার্টার ও চারধারের জমি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলে। সারাজায়গা মাটিতে বড়-বড় গর্ত, কোয়ার্টারের উঠোনে, রান্নাঘরের দেয়ালে, কাঁচা প্ল্যাটফর্মের মাঝে-মাঝে সর্বত্র গর্ত ও ফাটল আর ইঁদুরের মাটি। তবুও সে কিছু বুঝতে পারলে না।
একদিন সে স্টেশঘরে ঘুমিয়ে আছে, রাত অনেক। ঘর অন্ধকার হঠাৎ শঙ্করের ঘুম ভেঙে গেল। পাঁচটা ইন্দ্রিয়ের বাইরে আর একটা কোনো ইন্দ্রিয় যেন মুহূর্তের জন্যে জাগরিত হয়ে উঠে তাকে জানিয়ে দিলে যে সে ভয়ানক বিপদে পড়বে। ঘোর অন্ধকার, শঙ্করের সমস্ত শরীর যেন শিউরে উঠল। টর্চটা হাতড়ে পাওয়া যায় না কেন? অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা কিসের অস্পষ্ট শব্দ হচ্ছে ঘরের মধ্যে। হঠাৎ টর্চটা তার হাতে ঠেকল, এবং কলের পুতুলের মতো সে সামনের দিকে ঘুরিয়ে টর্চটা জ্বাললে।
সঙ্গে-সঙ্গেই সে ভয়ে বিস্ময়ে কাঠ হয়ে টর্চটা ধরে বিছানার ওপরই বসে রইল।
দেয়াল ও তার বিছানার মাঝামাঝি জায়গায় মাথা উঁচু করে তুলে ও টর্চের আলো পড়ার দরুন সাময়িক ভাবে আলো-আঁধারি লেগে থ-খেয়ে আছে আফ্রিকার ক্রুর ও হিংস্রতম সাপ-কালো মাম্বা। ঘরের মেঝে থেকে সাপটা প্রায় আড়াই হাত উঁচু হয়ে উঠেছে-সেটা এমন কিছু আশ্চর্য নয় যখন ব্ল্যাক মাম্বা সাধারণত মানুষকে তাড়া করে তার ঘাড়ে ছোবল মারে। ব্ল্যাক মাম্বার হাত থেকে রেহাই পাওয়া এক রকম পুনর্জন্ম তাও শঙ্কর শুনেছে।
শঙ্করের একটা গুণ বাল্যকাল থেকেই আছে, বিপদে তার সহজে বুদ্ধিভ্রংশ হয় না-আর তার স্নায়ুমণ্ডলীর উপর সে ঘোর বিপদেও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে।
শঙ্কর বুঝলে হাত যদি তার একটু কেঁপে যায়-তবে যে মুহূর্তে সাপটার চোখ থেকে আলো সরে যাবে-সেই মুহূর্তে ওর আলো-আঁধারি কেটে যাবে এবং তখুনি সে করবে আক্রমণ।
সে বুঝলে তার আয়ু নির্ভর করচে এখন দৃঢ় ও অকম্পিত হাতে টর্চটা সাপের চোখের দিকে ধরে থাকার ওপর। যতক্ষণ সে এ রকম ধরে থাকতে পারবে ততক্ষণ সে নিরাপদ। কিন্তু যদি টর্চটা একটু এদিক ওদিক সরে যায়?
শঙ্কর টর্চ ধরেই রইল। সাপের চোখ দুটো জ্বলচে যেন দুটো আলোর দানার মতো। কি ভীষণ শক্তি ও রাগ প্রকাশ পাচ্চে চাবুকের মতো খাড়া উদ্যত তার কালো, মিশমিশে, সরু দেহটাতে।
শঙ্কর ভুলে গেল চারপাশের সব আসবাব-পত্র, আফ্রিকা দেশটা, তার রেলের চাকরি, মোম্বাসা থেকে কিসুমু লাইনটা, তার দেশ, তার বাবা-মা-সমস্ত জগৎটা শূন্য হয়ে গিয়ে সামনের ওই দুটো জ্বলজ্বলে আলোর দানায় পরিণত হয়েচে, তার বাইরে শূন্য। অন্ধকার। মৃত্যুর মতো শূন্য, প্রলয়ের পরের বিশ্বের মতো অন্ধকার।
সত্য কেবল ওই মহাহিংস্র উদ্যত-ফণা মাম্বা, যেটা প্রত্যেক ছোবলে ১৫০০ মিলিগ্রাম তীব্র বিষ ক্ষতস্থানে ঢুকিয়ে দিতে পারে এবং দেবার জন্যে ওৎ পেতে রয়েছে।
শঙ্করের হাত ঝিমঝিম করছে, আঙুল অবশ হয়ে আসচে, কনুই থেকে বগল পর্যন্ত হাতের যেন সাড় নেই। কতক্ষণ সে আর টর্চ ধরে থাকবে? আলোর দানা দুটো হয়তো সাপের চোখ নয়-জোনাকি পোকা কিংবা নক্ষত্র-
কিংবা-
টর্চের ব্যাটারির তেজ কমে আসচে না? শাদা আলো যেন হলদে ও নিস্তেজ হয়ে আসচে না? কিন্তু জোনাকি পোকা কিংবা নক্ষত্র দুটো তেমনি জ্বলচে। রাত না দিন? ভোর হবে না সন্ধ্যা হবে?
শঙ্কর নিজেকে সামলে নিলে। ওই চোখ দুটোর জ্বালাময়ী দৃষ্টি তাকে যেন মোহগ্রস্ত করে তুলচে। সে সজাগ থাকবে। এ তেপান্তরের মাঠে চেঁচালেও কেউ কোথাও নেই সে জানে, তার নিজের স্নায়ুমণ্ডলীর দৃঢ়তার উপর নির্ভর করচে তার জীবন। কিন্তু সে পারচে না যে, হাত যেন টনটন করে অবশ হয়ে আসচে, আর কতক্ষণ সে টর্চ ধরে থাকবে? সাপে না হয় ছোবল দিক কিন্তু হাতখানা একটু নামিয়ে সে আরাম বোধ করবে এখন।
তার পরেই ঘড়িতে টং-টং করে তিনটে বাজলো। ঠিক রাত তিনটে পর্যন্তই বোধ হয় শঙ্করের আয়ু ছিল, কারণ তিনটে বাজবার সঙ্গে-সঙ্গে তার হাত কেঁপে উঠে নড়ে গেল-সামনের আলোর দানা দুটো গেল নিভে। কিন্তু সাপ
কই? তাড়া করে এল না কেন?
পরক্ষণেই শঙ্কর বুঝতে পারলে সাপটাও সাময়িক মোহগ্রস্ত হয়েচে তার মতো। এই অবসর! বিদ্যুতের চেয়েও বেগে সে টেবিল থেকে এক লাফ মেরে অন্ধকারের মধ্যে দরজার আগল খুলে ফেলে ঘরের বাইরে গিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলে।
সকালের ট্রেন এল। শঙ্কর বাকি রাতটা প্ল্যাটফর্মেই কাটিয়েছে। ট্রেনের গার্ডকে বললে সব ব্যাপার। গার্ড বললে, চলো দেখি স্টেশনঘরের মধ্যে। ঘরের মধ্যে কোথাও সাপের চিহ্নও পাওয়া গেল না। গার্ড লোকটা ভালো, বললে-বলি তবে শোনো। খুব বেঁচে গিয়েচ কাল রাত্রে। এতদিন কথাটা তোমায় বলিনি, পাছে ভয় পাও। তোমার আগে যিনি স্টেশনমাস্টার এখানে ছিলেন-তিনিও সাপের উপদ্রবেই এখান থেকে পালান। তাঁর আগে দুজন স্টেশনমাস্টার এই স্টেশনের কোয়ার্টারে সাপের কামড়ে মরেচে। আফ্রিকার ব্ল্যাক মাম্বা যেখানে থাকে, তার ত্রিসীমানায় লোক আসে না। বন্ধুভাবে কথাটা বললাম, ওপরওয়ালাদের বলো না যেন যে আমার কাছে থেকে এ কথা শুনেচ। ট্রান্সফারের দরখাস্ত কর।
শঙ্কর বললে-দরখাস্তের উত্তর আসতেও তো দেরি হবে, তুমি একটা উপকার কর। আমি এখানে একেবারে নিরস্ত্র, আমাকে একটা বন্দুক কি রিভলবার যাবার পথে দিয়ে যাও। আর কিছু কার্বলিক এ্যাসিড। ফিরবার পথেই কার্বলিক এ্যাসিডটা আমাকে দিয়ে যেও।
ট্রেন থেকে সে একটা কুলিকে নামিয়ে নিলে এবং দুজনে মিলে সারাদিন সর্বত্র গর্ত বুজিয়ে বেড়ালে। পরীক্ষা করে দেখে মনে হল কাল রাত্রে স্টেশনঘরের পশ্চিমের দেওয়ালের কোণে একটা গর্ত থেকে সাপটা বেরিয়ে ছিল। গর্তগুলো ইঁদুরের, বাইরের সাপ দিনমানে ইঁদুর খাবার লোভে গর্তে ঢুকেছিল হয়তো। গর্তটা বেশ ভালো করে বুজিয়ে দিলে। ডাউন-ট্রেনের গার্ডের কাছ থেকে এক বোতল কার্বলিক এ্যাসিড পাওয়া গেল-ঘরের সর্বত্র ও আশে-পাশে সে এ্যাসিড ছড়িয়ে দিলে। কুলিটা তাকে একটা বড় লাঠি দিয়ে গেল। দু-তিনদিনের মধ্যেই রেলকোম্পানি থেকে ওকে একটা বন্দুক দিলে।
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
