International Border Line in Bengali
International Border Line
সর্বভারতীয় বা রাজ্য স্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষাগুলিতে সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক ।আবার সাধারণ জ্ঞানের পরিসরও ব্যপক । বিভিন্ন টপিক থেকে Static GK এর উপর আসা প্রশ্নগুলি অধ্যয়ন করে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট টপিকের বিশদ আলোচনা করা হবে । এক্ষেত্রে এখন আলোচ্য টপিক রয়েছে International Border Line.
আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা
[International Border Line]
⟽ Previous Post : নোবেল পুরস্কার
1. র্যাডক্লিফ রেখা : ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ (Radcliffe Line : India – Pakistan – Bangladesh) : বিশ্বের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখাগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা হলঃ র্যাডক্লিফ রেখা (Radcliffe Line) যা 1947 সালের 12 ই আগস্ট নির্ধারিত হয় এবং 1947 সালের 17 ই আগস্ট থেকে কার্যকর হয় ।
র্যাডক্লিফ রেখার প্রেক্ষাপট অধ্যায়ন করলে দেখা যায় 1930 এর দশকে এই রেখার বীজ বপন হয় । 1919 সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ ভারতে যখন ব্রিটিশ শক্তিকে উচ্ছেদ করে স্বাধীন ভারতের আকাঙ্ক্ষায় বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে সেই সময় ভারত ভূখন্ডে দুটি প্রধান জাতির সহাবস্থান লক্ষ্যণীয়, যা হিন্দু ও মুসলিম নামে অভিহিত । 1930 এর দশকে, বলা যায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের জন্য ঐ সহাবস্থানে চিড় ধরতে আরম্ভ করে । এই সময় মুসলিমদের আলাদা আবাসভূমি (Separate Homeland for Muslims) ধারণার বিকাশের সূচনা হয় । 1932 সালের নভেম্বরে তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে ব্রিটিশ-ভারতীয় প্রতিনিধি হিসাবে চৌধুরী রহমত আলি উত্তর ভারতের পঞ্জাব, উঃ-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর, সিন্দ ও বালুচিস্তান এই পাঁচটি প্রদেশের 3 কোটি মুসলিমদের জন্য আলাদা আবাসভূমি হিসাবে পাকস্তান (Pakstan) নামের প্রস্তাব রাখেন । 1933 সালের 28 শে জানুয়ারি তিনি এই বিষয়ে “Now or Never; Are We to Live or Perish Forever?” নামক এক পুস্তিকা প্রকাশ করে যা “Pakistan Declaration” নামেও পরিচিত । 1935 সাল নাগাদ বৃটেন যখন সমগ্র ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে তাদের নীতির পর্যালোচনা আরম্ভ করে তখন ভারতে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নামক দুটি রাজনৈতিক শক্তি রাজনীতির ময়দানে পাশপাশি । এই সময় মুসলিম লীগ মুসলিম অধ্যুষিত আটটি প্রদেশে তাদের ক্ষমতা প্রসারে গুরুত্ব দেয় । 1935 সালের 2রা আগস্ট বৃটেনে “Government of India Act, 1935” পাস হলে সেই আইন অনুযায়ী সম্প্রদায় ভিত্তিক প্রথম ভোটগ্রহণ হয় এবং জাতীয় কংগ্রেস মুসলিম অধ্যুষিত আটটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টি প্রদেশে সরকার গড়ে । 1937-39 এই সময়কালে কংগ্রেস বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে, যার মধ্যে হিন্দু মহাসভার ক্রমবর্ধমান তৎপরতা, কংগ্রেসের তেরঙ্গা উত্তোলন, বন্দে মাতরম গাওয়া, কেন্দ্রিয় প্রদেশে বিদ্যা মন্দির প্রকল্প এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ওয়ার্ধা প্রকল্প এগুলিকে ‘কংগ্রেসের অত্যাচারের’ প্রমাণ হিসাবে ব্যাখ্যা করে মুসলিম লীগ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রচার চলায় এবং যার ফল হিসাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের উদ্ভব ঘটে । মুসলিম নেতারা বিশেষত মুসলিম লীগ প্রধান মহম্মদ আলি জিন্নাহ ‘অখণ্ড স্বাধীন ভারতে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হিসাবে থেকে যেতে পারে’ তার এই নিজস্ব ধারণার ভিত্তিতে চিন্তিত হন । 1938 সালের অক্টোবরে মুসলিম লীগের করাচি সম্মেলনের রেজুলেশনে মুসলিমদের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়ে সংবিধান পরিকল্পনার সুপারিশ দেওয়া হয় ফলে 1938-39 সালে বিভাজনের ধারণা দৃঢ়তা লাভ করতে থাকে । 1940 সালের মার্চে লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে মহম্মদ জাফরউল্লা খান ও তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক রচিত একটি বিবৃতি গৃহীত হয়, যা লাহোর প্রস্তাব (Lahore Resolution) নামে অভিহিত হয় । এই প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে আরো দৃঢ় করা হয় । এই অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে (Presidential Address) মহম্মদ আলি জিন্নাহ তার ভাষণের প্রায় প্রতিটি অংশে বিশেষ করে 23 তম অংশে অখণ্ড স্বাধীন ভারতে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের ডাক দিয়ে “দ্বিজাতি তত্ব” (Two Nations Theory) ধারণা উপস্থাপন করেন । 1940 সালের 6 ই এপ্রিল হরিজন পত্রিকায় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী জিন্নার দ্বিজাতি তত্বকে অসত্য বলে মতামত প্রকাশ করলেও তা গুরুত্ব পায়নি । 1942 সালের 23 এপ্রিল রাজাগপালাচারী মাদ্রাজ আইনসভায় নীতিগতভাবে দেশভাগকে মেনে নেওয়ার সুপারিশ করে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটিতে জমা দেওয়ার জন্য একটি প্রস্তাব পাস করেন কিন্তু 2 রা মে এলাহাবাদ কংগ্রেসে তা খারিজ হয়ে যায় । 1944 সালের এপ্রিলে অখণ্ড স্বাধীন ভারতের জন্য কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রতিনিধি হিসাবে চক্রবর্তী রাজাগপালাচারী ও মহম্মদ আলি জিন্নাহ এর মধ্যে আলোচনা হয়, যা 1944 সালের 9ই জুলাই “রাজাজি সূত্র” (Rajaji Formula) নামে প্রকাশিত হয় । কিন্তু এই আলোচনা ফলপ্রসু হয়নি, ফলে মুসলিম লীগ ভারত বিভাজনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে । 1946 সালের 16 ই আগস্ট, অর্থাৎ স্বাধীনতার ঠিক এক বছর পূর্বে মহম্মদ আলি জিন্নার “Direct Action Day” ঘোষণার পর কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ বাঁধে, যাতে প্রায় 5,000 জনের মৃত্য হয় । অশান্তির জেরে 1948 সালের জুনের পূর্বে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা রূপায়নের জন্য 1947 সালের মার্চে ব্রিটিশ সরকার মাউন্ট ব্যাটনকে ভারতে প্রেরণ করে । 1947 সালের 3রা জুন মাউন্ট ব্যাটন ঘোষণা করেন যে, 1948 সালের জুনের পূর্বে ভারত বিভাজন পরিকল্পনা ও ক্ষমতা হস্তান্তর কার্যকর হবে । ভারত বিভাজন পরিকল্পনা হিসাবে বৃটেন 11 দফা প্রস্তাবও পেশ করে ঐ দিন । যদিও মাউন্ট ব্যাটনের পূর্ববর্তী ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল ইতিপূর্বেই দুই দেশের সীমান্ত রেখার একটি খসড়া প্রস্তুত করেন, তা সত্বেও খণ্ডিত ভারতবর্ষ থেকে সৃষ্ট স্বাধীন দুটি দেশের সীমানার গঠন তথা পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে যথাক্রমে বঙ্গ ও পঞ্জাব প্রদেশের বিভাজিত সীমান্ত নির্ধারণের উদ্দেশ্যে বৃটেন 1947 সালের জুনে Two Boundary Commissions এর অধ্যক্ষ হিসাবে ব্রিটিশ আইনজীবী Cyril John Radcliffe কে নিয়োজিত করে । 8 ই জুলাই র্যাডক্লিফ ভারতে পৌঁছায় এবং সীমান্ত রেখা নির্ধারণের জন্য র্যাডক্লিফ পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের জন্য পৃথকভাবে দুজন করে মুসলিম লীগ ও দুজন করে কংগ্রেসের সদস্য অর্থাৎ একেকটি সীমান্ত রেখা নির্ধারণের জন্য মোট চারজন করে সদস্য নিয়ে এবং নিজেকে তাদের তত্বাবধায়ক হিসাবে রেখে কমিশন গঠন করেন । পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে তিনি দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত অংশের সীমা রেখা নির্ধারণ করেন, যা সেই সময় র্যাডক্লিফ রেখা নামে ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত রেখা হিসাবে বিবেচিত হয় ।
12 ই আগস্ট এই সীমান্ত রেখা নির্ধারণ সম্পূর্ণ হলেও ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন এই দুটি দেশ গঠনের দু’দিনের মাথায় অর্থাৎ 17 ই আগস্ট থেকে র্যাডক্লিফ রেখা কার্যকর হয় । ভারতের পূর্ব সীমান্তের র্যাডক্লিফ রেখা 1971 সালের পর থেকে অর্থাৎ স্বাধীন বাংলদেশ গঠনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নামে পরিচিতি লাভ করে । ভারতের পশ্চিম সীমান্তে এই রেখা বর্তমানে তিনটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের উপর দিয়ে 3,323 কিঃমিঃ প্রসারিত হয়েছে । এর মধ্যে একমাত্র কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসাবে জম্মু-কাশ্মীর সীমান্তে 1222 কিঃমিঃ (এর মধ্যে 772 কিঃমিঃ “সিমলা চুক্তি-1972” অনুযায়ী Line of Control নামে অভিহিত হয়) এবং রাজ্যের সীমান্ত হিসাবে পঞ্জাবে 425 কিঃমিঃ, রাজস্থানে 1170 কিঃমিঃ ও গুজরাট সীমান্তে 506 কিঃমিঃ দীর্ঘ ।
3,323 কিঃমিঃ সীমান্তের মধ্যে গুজরাট থেকে জম্মু পর্যন্ত 2,313 কিঃমিঃ BSF দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় । 772 কিঃমিঃ দীর্ঘ LOC নিয়ন্ত্রিত হয় ভারতীয় সেনা দ্বারা এবং অবশিষ্ট 238 কিঃমিঃ উভয় বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় ।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত রেখা বরাবর চারটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চৌকি রয়েছে, এগুলি হলঃ i) পঞ্জাবের অমৃতসরের নিকট বাঘা-আটারী (Wagah-Attari) সীমান্ত চৌকি, ii) পঞ্জাবের ফিরোজপুরের নিকট হুসেইনিওয়ালা-গন্ডা সিংহ ওয়ালা (Hussainiwala-Ganda Singh Wala) সীমান্ত চৌকি, iii) পঞ্জাবের ফাজিলকার নিকটবর্তী সদিকুই-সুলেমানকি (Sadiqui-Sulemanki) সীমান্ত চৌকি এবং iv) রাজস্থানের বারমের জেলায় অবস্থিত মুনাবাও-খোকরাপার (Munabao-Khokhrapar) সীমান্ত চৌকি । এই চারটি সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন সন্ধ্যে 6 টায় দুই দেশের সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে Beating Retreat Flag Ceremonie অনুষ্ঠিত হয় যা ভারতীয় নাগরিক কোনরকম বিশেষ অনুমতি ছাড়াই ভারতে বসে উপভোগ করতে পারে ।
কর্তারপুর করিডর (Kartarpur Corridor) : কর্তারপুর করিডর হল একটি ধার্মিক করিডর যা র্যাডক্লিফ রেখার পশ্চিমে ভারতের পঞ্জাব রাজ্যের গুরুদাসপুর জেলায় অবস্থিত দেরা বাবা নানক গুরদ্বারা (Gurudwara Dera Baba Nanak) ও পশ্চিম প্রান্তে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের নারোয়াল জেলায় অবস্থিত কর্তারপুরের গুরদ্বারা দরবার সাহিবের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের শিখ ধর্মাবলম্বী মানুষ বিনা ভিসায় পাকিস্তানে অবস্থিত তাদের ধর্মপীঠে যাতায়ত করতে পারেন ।
1999 সালের প্রথম দিকে দিল্লী-লাহোর বাস পরিষেবা কূটনীতির অংশ হিসাবে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরীফ এই করিডর প্রস্তাব করেন । 2018 সালের 26 শে নভেম্বর ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদী ভারতের দিকে এবং 28 শে নভেম্বর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তানের দিকে এই করিডোরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন । 2019 সালের 12 ই নভেম্বর গুরু নানকের 550 তম জন্মবার্ষিকীতে করিডোরের কাজ সম্পন্ন হয়, যদিও তার দুদিন পূর্বে 9 ই নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজ নিজ দেশে করিডোরের উদ্বোধন করেন । এই সময় পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অমরিন্দ্র সিংহ (Captain Amarinder Singh) । তৎকালীন পঞ্জাবের PWD মন্ত্রী বিজয় সিংলা (Vijay Inder Singla) এর মতে ভারতের দিকে এই করিডোরের দৈর্ঘ্য 4.2 কিঃমিঃ । করিডোরের মোট দৈর্ঘ্য 6.3 কিঃমিঃ । করিডোর উন্মোচনের পর প্রথম তীর্থযাত্রী দলে 570 জন পুণ্যার্থী কর্তারপুরের গুরদ্বারা দরবার সাহিবে যান, যার মধ্যে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ এবং তৎকালীন পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দ্র সিংহও ছিলেন ।
2. ম্যাকমোহন রেখা, ভারত ও চীনের আন্তর্জাতিক সীমানা (McMohan Line, India-China International Border) :
ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা হল ম্যাকমোহন রেখা যা 1914 সালে, অর্থাৎ বৃটিশ শাসিত ভারতে সিমলা সম্মেলনে (Shimla Convention) নির্ধারিত হয় । রেখাটি ভুটানের পশ্চিম সীমান্ত থেকে ভারতের উঃ-পূর্ব ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি বর্তমান অরুণাচল প্রদেশের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত বরাবর বর্তমান স্বাধীন মায়ানমারের ইজু রাজি পাস (Izu Razi Pass) পর্যন্ত 890 কিঃমিঃ বিস্তৃত ।
1914 সালের মার্চে চীন, তিব্বত ও বৃটিশ ভারতের ত্রিপাক্ষিক আলোচোনা ও চুক্তির মাধ্যমে এই রেখা নির্ধারিত হয় । এই চুক্তিতে চীনের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করেন ইভান চেন (Ivan Chen), তিব্বতের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করেন লোন-চেন সাতরা (Lon-Chen Shatra) এবং ব্রিটিশ ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে অংশগ্রহণ করেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত সরকারের পররাষ্ট্র সচিব লেফটেনেন্ট কর্ণেল হেনরি ম্যাকমোহন (Sir Vincent Arthur Henry McMahon) । এই চুক্তি অনুযায়ী হেনরি ম্যাকমোহন চীন ও ভারতের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত তিব্বতকে বহিঃ তিব্বত (Outer Tibbet) ও অন্তঃ তিব্বত (Inner Tibbet) এই দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন । ভারত সীমান্তবর্তী তিব্বতকে বহিঃ তিব্বত হিসাবে অভিহিত করা হয়, যার মধ্যে লাসা, সিঘাতসে এবং চেমডো অন্তর্ভুক্ত হয় । অন্যদিকে চীন সীমান্ত সংলগ্ন অংশকে অন্তঃ তিব্বত নামে অভিহিত করা হয়, যার মধ্যে বা-ট্যাং, লি-ট্যাং ও ট্যাচিয়েনলু অন্তর্ভুক্ত হয় । অর্থাৎ ম্যাকমোহন রেখা নির্ধারণ করার সময় এই রেখা তিব্বত ও ব্রিটিশ ভারতের সীমান্ত রেখা হিসাবে নির্ধারিত হয়, সরাসরি চীন ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে নয় । 1951 পর্যন্ত ম্যাকমোহন রেখা তিব্বত ও স্বাধীন ভারতের আন্তর্জাতিক রেখা হিসাবেই বিবেচিত হত । 1951 সালের অক্টোবরে চীনের চাপে তিব্বতের দলাইলামা সরকার “Seventeen Point Agreement” এ স্বাক্ষর করলে পরোক্ষভাবে তিব্বতের শাসন ক্ষমতা চলে যায় চীনের হাতে । 1959 সালের মার্চে রিপাবলিক চীন তিব্বতের রাজধানী লাসা আক্রমণ করলে তৎকালীন দলাইলামা সরকারের প্রধান তথা 14 তম দলাইলামা গ্যায়ালওয়া রিনপোচে (Gyalwa Rinpoche) 17 ই মার্চ লাসা ছেড়ে পলায়ন করলে তিব্বতের শাসন ক্ষমতা চীনের হাতে চলে আসে এবং ভারত-তিব্বত সীমান্ত যা ম্যাকমোহনের সময় স্থির হয় তা ভারত-চীন সীমান্তে রূপান্তরিত হয় ।
ভারত প্রথম থেকেই ম্যাকমোহন রেখাকে দেশের সীমান্ত হিসাবে মেনে ‘Actual Line of Control (LAC)’ হিসাবে গ্রহণ করলেও চীন তা অস্বীকার করে । তিব্বতে চীনা অধিগ্রহণের পর চীন সেনা ম্যাকমোহন রেখা বরাবর পেট্রোলিং আরম্ভ করলে ভারত সরকারও সীমান্ত বরাবর সেনা পেট্রোলিং আরম্ভ করে । 1961 সাল নাগাদ চীনা সেনা ম্যাকমোহন রেখা অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখন্ডে প্রবেশ করলে ভারত সরকার ও চীন সরকারের মধ্যে ম্যাকমোহন রেখা নিয়ে দ্বন্দ প্রকাশ্যে আসে এবং ম্যাকমোহন রেখার বৈশিষ্ট্য ভারত-চীন সীমান্ত রেখা হিসাবে গুরুত্ব লাভ করে ।
3. ডুরাণ্ড রেখা, আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত এর আন্তর্জাতিক সীমান্ত (Durand Line, International Border of Afghanistan-Pakistan-India) : বৃটিশ ভারতে নির্ধারিত একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা হলঃ ডুরাণ্ড রেখা, যা 1893 সালের 12 ই নভেম্বর আফগানিস্তানের শাসক Abdur Rahman Khan এবং ব্রিটিশ ভারতের বিদেশ সচিব Sir Mortimer Durand এর আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় । এই রেখা পাস্তুন উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলকে দ্বি বিভক্ত করে নির্ধারিত হওয়ায় সেই সময় আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ভারত এবং বর্তমানে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সমস্যা থেকেই গেছে ।
1947 সালে ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশ হিসাবে ভারত ও পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করলে ডুরাণ্ড রেখা পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ভারতের আন্তর্জাতিক সীমারেখা হিসাবে অবস্থান করে । এই সীমারেখার মোট দৈর্ঘ্য 2,670 কিঃমিঃ যার অধিকাংশই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এবং মাত্র 106 কিঃমিঃ ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে অবস্থিত । বর্তমানে এই 106 কিঃমিঃ পাকিস্তান অধিগৃহীত (অক্টোবর, 1947) জম্মু-কাশ্মীরে অবস্থিত । রেখাটি দক্ষিণে ইরান সীমান্ত এবং উত্তরে চীন সীমান্ত স্পর্শ করে রয়েছে ।
4. হিন্ডেনবার্গ রেখা (Hindenburg Line) : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় 1917 সালে জার্মান ফিল্ড মার্শাল Paul von Hindenburg এর তত্বাবধানে জার্মানি পশ্চিম সীমান্ত তথা পোল্যান্ড সীমান্ত বরাবর নির্মিত আত্মরক্ষা মূলক কৃত্রিম সীমান্তরেখা হল হিন্ডেনবার্গ রেখা । 1919 সালের 28 শে জুন জার্মানি ও অক্ষশক্তির মধ্যে treaty of Versailles চুক্তির পর এই রেখার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয় । 20 টি ভাগে এই রেখা মোট 140 কিঃমিঃ দীর্ঘ ।
5. ম্যান্নারহেইম রেখা (Mannerheim Line) : ফিনল্যান্ড ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যবর্তী ফিনল্যান্ডের আত্মরক্ষা মূলক কৃত্রিম সীমান্ত রেখা হল ম্যান্নারহেইম রেখা । সোভিয়েত ইউনিয়নে অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে 1917 সালে ফিনল্যান্ড স্বাধীনতা অর্জন করলেও রাশিয়ার আক্রমণের ভয়ে ফিনল্যান্ডের সেনা অধ্যক্ষ Carl Gustaf Emil Mannerheim এর নেতৃত্বে এই সীমানা গঠন করা হয় । 1920–1924 ও 1932–1939 সালের মধ্যে দুটি পর্যায়ে এই সীমান্ত রেখা নির্মাণ সম্পন্ন হয় । সীমান্ত রেখার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 135 কিঃমিঃ ।
6. 49 তম সমান্তরাল রেখা (49th Parallel Line) : আলাস্কা সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যবর্তী প্রায় 8,891 কিঃমিঃ সীমান্ত রেখা হল 49 তম সমান্তরাল রেখা । দুই দেশের সীমান্ত নির্ধারক এই রেখাটি 49 ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখাকে অনুসরণ করে নির্ধারিত হয়েছে বলে এরূপ নামকরণ । একে আবার Medicine Line বলেও অভিহিত করা হয় ।
এছাড়া 36 তম সমান্তরাল রেখা (36th Parallel Line) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী ও আরকানসাস প্রদেশের মধ্যে, 40 তম সমান্তরাল রেখা (40th Parallel Line) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা ও কানসাস প্রদেশের মধ্যে, 41 তম সমান্তরাল রেখা (41th Parallel Line) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ও নেব্রাস্কার মধ্যে, 42 তম সমান্তরাল রেখা (42th Parallel Line) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা ও দক্ষিণ ডাকোটা প্রদেশের মধ্যে সীমান্ত রেখা সৃষ্টি করেছে ।
7. ওদের-নেইসে রেখা (Oder-Neisse Line) : পূর্ব জার্মানি এবং পোল্যান্ড এর মধ্যবর্তী সীমান্ত রেখা Oder-Neisse Line হিসাবে পরিচিত । 1950 ও 1990 সালে দুই দেশের সরকারের আলোচনার প্রেক্ষিতে এই রেখা নির্ধারিত হয় । চেক রিপাবলিক থেকে নির্গত ওদের নদীর 187 কিঃমিঃ গতিপথ ও জাইরে পর্বত থেকে নির্গত লুসাটিয়ান নেইসে নদীর 197 কিঃমিঃ দীর্ঘ গতিপথ নিয়ে এই সীমান্ত নির্ধারিত হওয়ায় সীমান্ত রেখার এরূপ নামকরণ ।
8. 17 তম সমান্তরাল রেখা (17th Parallel Line) : প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের ফল স্বরূপ উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্রের সূচনা হয় । 1945 সালের 21শে জুলাই জেনেভা সম্মেলনে 17 ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখার সমান্তরালে দুই দেশের মধ্যবর্তী সীমানা নির্ধারিত হয় । 17 ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখার সমান্তরালে সীমানা নিধারিত হওয়ায় রেখাটির এরূপ নামকরণ । দুই দেশের মধ্যবর্তী এই সীমান্তের দৈর্ঘ্য 76.1 কিঃমিঃ ।
9. 20 তম সমান্তরাল রেখা (20th Parallel Line) : উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার সুদানের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক সীমান্তের একটি অংশ 20 ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখাকে অনুসরণ করে নির্ধারিত হয়েছে, যা 20 তম সমান্তরাল রেখা নামে পরিচিত । এই সীমান্ত রেখার দৈর্ঘ্য 105 কিঃমিঃ ।
10. 35 তম সমান্তরাল রেখা (35th Parallel Line) : দক্ষিণে জর্জিয়ার সাথে উত্তরে অবস্থিত টেনেসি ও উত্তর ক্যারোলিনার সীমান্ত রেখা যা 35 ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখার সমান্তরালে পূর্বে Ellicott’s Rock থেকে পশ্চিমে Nickajack পর্যন্ত বিস্তৃত । 1826 সালে 177 কিঃমিঃ দীর্ঘ এই সীমান্ত রেখা স্থায়ীভাবে নির্ধারিত হয় ।
11. 36°30′ তম সমান্তরাল রেখা (36°30′ th Parallel Line) : মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী ও আরকানসাস, টেনেসি ও কেনটাকি, ওকলাহোমা ও টেক্সাস এবং ভার্জিনিয়া ও উত্তর ক্যারোলিনা এইসমস্ত প্রদেশের মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক সীমান্তরেখা, যা 36°30′ উত্তর অক্ষরেখাকে অনুসরণ করে নির্ধারিত হয়েছে ।
12. 37 তম সমান্তরাল রেখা (37th Parallel Line) : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট ছয়টি প্রদেশের মধ্যবর্তী সীমান্ত রেখা যা উত্তরে 38° উত্তর অক্ষরেখাকে অনুসরণ করে নির্ধারিত হয়েছে । এই ছয়টি প্রদেশের মধ্যে উত্তরের পাশাপশি অবস্থিত তিনটি প্রদেশ হল পশ্চিম থেকে পূর্বে উটা, কলোরাডো ও কানসাস এবং দক্ষিণে পাশাপশি অবস্থিত তিনটি প্রদেশ হল পশ্চিম থেকে পূর্বে অ্যারিজোনা, নিউ ম্যাক্সিকো ও ওকলাহোমা । 1854 সালে এই সীমান্ত নির্ধারিত হয় ।
13. 38 তম সমান্তরাল রেখা (38th Parallel Line) : উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এই দুই দেশের সাধারণ সীমানা 38 তম সমান্তরাল রেখা নামে অভিহিত । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়া ভূখন্ডে মার্কিন ও সোভিয়েত আধিপত্যের ভিত্তিতে কোরিয়াকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করা হয় । এই পরিকল্পনা রূপায়নের জন্য Charles Bonesteel ও Dean Rusk নামক দুই মার্কিন সেনা প্রধান 1945 সালের 10 ই আগস্ট মিলিত হন এবং National Geographic Map অধ্যয়ন করে দেখেন যে 38 ডিগ্রি অক্ষরেখা কোরিয়াকে দ্বিখন্ডিত করে বিস্তৃত হয়েছে । 14 ই আগস্ট তারা 38 ডিগ্রি অক্ষরেখাকে কোরিয়া ভূখন্ডের বিভাজন রেখা হিসাবে উপস্থাপন করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তা স্বীকার করে এবং উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্ত রেখা হিসাবে 38 তম সমান্তরাল রেখা ধার্য হয় । বর্তমানে এই রেখা মান্য নয়, বরং 1953 সালের 27 শে জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত Korean Armistice Agreement অনুযায়ী 38 ডিগ্রি অক্ষরেখার উত্তরে এবং প্রায় সমান্তরালে চিহ্নিত 250 কিঃমিঃ দীর্ঘ Military Demarcation Line (MDL) কে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্ত রেখার হিসাবে ধরা হয় । ➣ Read in English ➣ Read in Hindi
➣ পরবর্তী পোস্ট : আন্তর্জাতিক প্রণালী
#তথ্যসূত্র :
1. “Reading like a Historian” : Stanford History Education Group
2. “Lahore Resolution” : Wikipedia
3. “The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan” : Ayesha Jalal
4. “Presidential address by Muhammad Ali Jinnah to the Muslim League
Lahore, 1940” : link : http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00islamlinks/txt_jinnah_lahore_1940.html
5. “Jinnah – Gandhi Talks (1944)” : https://historypak.com/jinnah-gandhi-talks-1944/
6.”Borderline, Peacock at Sunset” : Franc Jacobs
7. “The McMohan Line” : E. Bruke Inlow
8. “Truth About McMahon Line” : J.P Mitter
9. “Annexation of Tibet by the People’s Republic of China” :
10. “Sino-Indian War” : Wikipedia
11. “A Selection of Historical Maps of Afghanistan” : Cynthia Smith
12. “Durand Line”: Wikipedia
13. “The history of the Mannerheim Line” : Sami Korhanen
14. “Libya–Sudan border” : Wikipedia
15. “How Georgia got its northern boundary – and why we can’t get water from the Tennessee River” :
Jamil Zainaldin
16. “Korean Demilitarized Zone” : Wikipedia
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
