King Crab of Sundarbans in Search of Blue Blood
The “King Crab” of the Sundarbans in Search of Blue Blood
প্রবন্ধ হল নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ভাষা চর্চার তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা । জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধি ও ভাষা বোধের দক্ষতার জন্য প্রবন্ধ পাঠ অনিবার্য । সেই উদ্দেশ্যেই আমরা আরম্ভ করেছি প্রবন্ধ নির্যাস নামক বিভাগ । এই বিভাগে সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধরনের বিষয়বস্তু অবলম্বনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে । বর্তমান প্রবন্ধ King Crab of Sundarbans in Search of Blue Blood এ ম্যানগ্রোভ ম্যান সুন্দরবনের রাজ কাঁকড়ার উপর তথ্য অন্বেষণ করেছেন।
নীল রক্তের খোঁজে সুন্দরবনের “রাজ কাঁকড়া”
⟽ Previous Post : সবুজ কাছিম রহস্য
অশ্বক্ষুরের ন্যায় দেখতে উপবৃত্তাকার এই কাঁকড়া হলো Horseshoe Crab Limulus, যা “রাজ কাঁকড়া” নামেও পরিচিত। এটিকে কাঁকড়া বলা হলেও প্রজাতিগত দিক থেকে কিন্তু মাকড়সার সঙ্গেই বেশি মিল রয়েছে এর। এরা লিমুলিডি গোত্রের অন্তর্গত সামুদ্রিক সন্ধিপদী। এরা প্রধানত অগভীর সমুদ্র ও নরম বালি বা কাদা সমৃদ্ধ সমুদ্রতলে বাস করে। কালেভদ্রে যৌনসঙ্গমের জন্য এদের ডাঙায় আসতে দেখা যায়। চাষের কাজে সার হিসেবে এবং মাছ ধরার সময় টোপ হিসেবে এদের ব্যবহার আছে। সাম্প্রতিককালে জাপানে এদের সমুদ্রতটবর্তী বাসভূমি ধ্বংসের কারণে এবং উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে অত্যধিক চাষের কারণে এদের সংখ্যা কমে গেছে। থাইল্যান্ডের সমুদ্রোপকূলে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর ডিমের মধ্যে সম্ভবত টেট্রোডোটক্সিন-এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
প্রতি গ্রীষ্মে আমেরিকার মেক্সিকো উপসাগর থেকে এসে মূল উপসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলবর্তী এলাকায় ঝাঁক বেঁধে অবস্থান করে এই কাঁকড়ার দল।
[১] আজ থেকে ৪৫ কোটি বছর আগে বিবর্তিত হয়ে এতদিন প্রায় অবিকৃত চেহারায় থেকে যাওয়ার জন্য এদের জীবন্ত জীবাশ্ম হিসেবে গণ্য করা হয়।
[২] এই কাঁকড়ার নীল রক্ত বহুমূল্যবান। এই রক্তের অসাধারণ ক্ষমতা বলে লিমিউলাস বা
অশ্বক্ষুরাকৃতি কাঁকড়ারা যে কোনও ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।
কাঁকড়ার রক্তে অ্যামিবোসাইট আছে। এই অ্যামিবোসাইটে মাত্র এক লাখ কোটি ভাগের এক ভাগ ব্যাকটিরিয়ার উপস্থিতিতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। যেখানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে সময় লাগে ৪৮ ঘণ্টা। কীভাবে এই অ্যামিবোসাইট তৈরি হয়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
এই Limulus Amoebocyte Lysate (LAL) ব্যবহার শুরু হয় সত্তরের দশকে। সামান্যতম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও তাই বুঝতে পারে এটি। চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা ভ্যাকসিনেও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পরীক্ষায় ব্যবহার হয় এটি।
এই কাঁকড়াগুলি আসলে জীবনদায়ী। এরা নিজেরাই রক্ত দেয় বলা যায়।প্রতি বছর প্রায় ছয় লাখ কাঁকড়া ধরা হয় আমেরিকার সমুদ্রতট থেকে। এর মধ্যে তাদের থেকে ৩০ শতাংশ রক্ত নেওয়া হয়।
এই নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ বেশ কয়েকজন প্রাণীবিজ্ঞানী জানায়, ১০-২০ শতাংশ কাঁকড়া এর ফলে মারা যায়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজার্ভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন) একে ‘ভালনারেবল’ বলে ঘোষণা করে ‘রেড লিস্ট’-এ রেখেছে।
আগামী ৪০ বছরে আমেরিকায় এই কাঁকড়ার সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে, জানিয়েছে আইইউসিএন। শুরু হয়েছে প্রজাতি সংরক্ষণ।
বিজ্ঞানীরা একটি কৃত্রিম পদার্থ তৈরি করতে চেষ্টা করছেন যেটি LAL এর সমগোত্রীয়। কারণ এই জীবনদায়ী রক্তের সঙ্গে মানুষের জীবনও জড়িত।
এদের জীবন্ত জীবাশ্মও বলা হয়, কারণ ৪৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে এদের অস্তিত্ব ছিল। ডাইনোসরের চেয়েও প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল এই লিমিউলাস। তাই এই জলজ প্রাণী বিজ্ঞানীদের কাছে আজও বিস্ময়।
রাজ কাঁকড়ার অশ্বখুরাকৃতির দেহ সম্মুখে সেফালোথোরাক্স বা প্রোছোমা এবং পশ্চাদ উদর বা অপিছথোছোমায় বিভক্ত; অপিছথোছোমা পিছনের দিকে বর্ধিত হয়ে পুচ্ছ কাঁটা বা টেলসনে পরিণত হয়। খন্ডায়নবিহীন প্রোছোমার সামনের অংশ প্রশস্ত গোলাকার এবং পশ্চাদ-পার্শ্বীয় প্রান্ত সুস্পষ্ট, অপেক্ষাকৃত ভোঁতা কাঁটাযুক্ত প্রসেসের মতো; উত্তল পৃষ্ঠীয় অংশের মধ্য অংশে একটি এবং এর দুইপাশে দুইটি রিজ বিদ্যমান। মধ্য এবং পাশের রিজগুলোর মাঝে অবনত অংশে লালচে দাগ থাকে। মধ্য রিজের সামনের প্রান্তের দুই পাশে সুস্পষ্ট, প্রশস্ত টিউবারকলে অস্পষ্ট সরলাক্ষি বিদ্যমান। পার্শ্বীয় রিজের পশ্চাদ অর্ধাংশে বিদ্যমান একই ধরনের টিউবারকলের গোড়ার দিকে সুস্পষ্ট পুঞ্জাক্ষি থাকে। মধ্য এবং পার্শ্বীয়দিকের রিজে কিছু সংখ্যক পশ্চাদ অভিমুখী আনুবীক্ষনিক কাঁটা থাকে যা পরিণত অবস্থায় খালি চোখে দেখা যায়। প্রোছোমার পশ্চাদ পার্শ্বীয় অংশের বাহিরের ও ভিতরের কিনারা মসৃণ। অপিছথোছোমা একটি আড়াআড়ি কব্জা দ্বারা প্রোছোমার সাথে যুক্ত; কিছুটা চর্তুভূজাকার অপিছথোছোমার পিছনের দিকে বিদ্যমান সুস্পষ্ট গর্তের মধ্যে বর্শা-আকৃতির লেজ বা টেলসন লাগানো থাকে। প্রতিটি খাঁজকাটা পার্শ্বীয় প্রান্তে ৭ টি স্থির এবং ৬টি সঞ্চালনশীল কাঁটা থাকে। খাটো, তীক্ষ্ম, প্রশস্ত ভিত্তিযুক্ত এবং সামান্য বড় আকৃতির কাঁটাগুলো স্থির কাঁটা দুইটির মাঝের গর্তগুলোর মধ্যে লাগানো থাকে। পুচ্ছ কাঁটার গোড়াদিকের স্থির কাঁটাগুলো অন্যান্য স্থির কাঁটার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় ও প্রশস্ত। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী প্রজাতির প্রথম তিনটি সঞ্চালনশীল কাঁটা অন্যান্যগুলোর চেয়ে বেশ লম্বা। অপিছথোছোমার মধ্য রিজ কাঁটাবিহীন, এবং এর উভয় পাশের ভিতরের দিকে ছয়টি সূক্ষ্ম অবনত অংশ এবং বাহিরের দিকে বড় অবণত অংশের সারি বিদ্যমান। অপিছথোছোমার পৃষ্ঠীয় অংশ প্রোছোমার চেয়ে কম উত্তল।
প্রোছোমার অংকীয়দিকের সামনের অর্ধাংশের মধ্যবর্তী স্থানে একটি সুস্পষ্ট, তীক্ষ্ম কাঁটা এবং চোয়ালবিহীন মুখের চারপাশে নলের মতো সুস্পষ্ট উপাঙ্গ থাকে। অপিছথোছোমা একজোড়া লম্বা পশ্চাদ-পার্শ্বীয় কাঁটা বহন করে। মেছোছোমাটিক উপাঙ্গের মতো ছয় জোড়া অংকীয় পেটের প্রথম জোড়া মাংসল জনন অপারকুলাম বহন করে এবং পরবর্তী ৫ জোড়ায় বুকগিল (bookgills) থাকে। উপাঙ্গগুলোর মাঝে নরম স্কেরাইট থাকে। পুচ্ছ কাঁটার (টেলসন) পৃষ্ঠীয় অংশ উত্তল গোলাকার এবং অংকীয় অংশ চ্যাপ্টা থেকে উত্তল। Carsinoscorpius rotundicauda এ অংকীয় খাজ অথবা পার্শ্বীয় বা পৃষ্ঠীয় রিজ থাকে না তবে Tachypleus gigas এ ত্রিকোনাকার, খাজযুক্ত পৃষ্ঠীয় কীল এবং অংকীয় লম্বালম্বি খাজ থাকে যা আকারে বেশ বড়। এটি ক্রমশ: এর পিছনের ভোঁতা প্রান্তের দিকে সরু হতে থাকে; দেহের অন্যান্য অংশের চেয়ে লম্বা এবং নড়াচড়া করাতে পারে এমনভাবে উদরীয় খাজে সংযুক্ত থাকে (Chowdhury and Hafizuddin, ১৯৮০)। যৌন দ্বিরূপতা সুস্পষ্ট। পুরুষের আকার ছোট হওয়ায় সহজেই স্ত্রী প্রাণী থেকে পৃথক করা যায় এবং এদের নখরযুক্ত প্রথম দুইটি চলন পায়ের স্ফীত প্রোপ্রোডাস (propodus) সঙ্গমের সময় ক্লাসপার হিসেবে কাজ করে।
বর্ণ: দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব অংশে প্রাপ্ত আর্দশ C. rotundicauda বাদামী অথবা গাঢ় বাদামী যা এদের আবাসস্থলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সুন্দরবনের C. rotundicauda গাঢ় সবুজ অথবা সবুজাভ কালো রঙের তবে T. gigas এর সমভাবে বিস্তৃত ধূসর রঙের পৃষ্ঠীয় অংশ এবং ফ্যাকাসে ধূসর অংকীয় অংশ বালুময় আবাসস্থলের সাথে সহজেই মিশে যায়।
C. rotundicauda এর পরিমাপ: পুরুষ: প্রোছোমার দৈর্ঘ্য ৬.৫-৮.৯ সেমি; প্রস্থ ১৩-১৬.৮ সেমি; অপিছথোছোমার দৈর্ঘ্য ৫.২-৬.২ সেমি; প্রস্থ ৮.৪-১১ সেমি; দেহের মোট দৈর্ঘ্য (পুচ্ছ কাটা ব্যতীত) ১১.৭-১৫.১ সেমি; পুচ্ছ কাঁটা/টেলসনের দৈর্ঘ্য ১৩.২-১৭.৪ সেমি। প্রথম প্রান্তীয় কাঁটার দৈর্ঘ্য ০.৭৮-০.৮৮ সেমি। স্ত্রী: প্রোছোমার দৈর্ঘ্য ৭.৯-৯ সেমি; প্রস্থ ১৫.২-১৮ সেমি; অপিছথোছোমার দৈর্ঘ্য ৫.৭-৭.১ সেমি; প্রস্থ ১০.৪-১১ সেমি; দেহের মোট দৈর্ঘ্য (পুষ্প কাঁটা ব্যতীত) ১৩.৬-১৬.১ সেমি; পুচ্ছ কাঁটার দৈর্ঘ্য ১৪.৪-১৭.১ সেমি। প্রথম প্রান্তীয় কাঁটার দৈর্ঘ্র ০.৮৭-০.৮৯ সেমি (অশ্বখুরাকৃতি কাঁকড়ার মধ্যে সবচেয়ে ছোট) T. gigas এর পরিমাপ: দেহের মোট দৈর্ঘ্য ৩৫ সেমি (সর্বোচ্চ ৫০ সেমি)। দেহের ব্যস ২৫ সেমি। পুরুষ: প্রোসোমা: দৈর্ঘ্য ৮.৯-৯.১ সেমি; প্রস্থ ১৭.৮-১৮.২ সেমি; অপিছথোছোমার: দৈর্ঘ্য ৬.৬-৬.৮২ সেমি; প্রস্থ ১০.৫-১০.৯ সেমি; দেহের মোট দৈর্ঘ্য (পুচ্ছ পাখনা বাদে) ১৫.৫-১৫.৯২ সেমি; পুচ্ছ পাখনার দৈর্ঘ্য ১৮.২-১৮.৭ সেমি। প্রথম প্রান্তীয় কাটার দৈর্ঘ্য ১.৫৮ সেমি। স্ত্রী: প্রোছোমার: দৈর্ঘ্য ৮.৩১-৯.৭ সেমি; প্রস্থ ১৭.৫-২২.২ সেমি; অপিছথোছোমা: দৈর্ঘ্য ৭.১-৮.৫ সেমি; প্রস্থ ৯৭.০-১৩.৮ সেমি; দেহের মোট দৈর্ঘ্য (পুচ্ছ পাখনা ব্যতীত) ১৫.৪-২০.২ সেমি; পুচ্ছ কাঁটার দৈর্ঘ্য: ১৬-২১.৩ সেমি; প্রথম প্রান্তীয় কাঁটার দৈর্ঘ্য ১.৫৯ সেমি।
সাধারণত রাজ কাঁকড়ার জীবন চক্র ডিম, লার্ভা, জুভেনাইল এবং পূর্ণাঙ্গ দশা নিয়ে গঠিত। এরা ৯-১২ বছর বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ আকারে সুস্পষ্টভাবে ছোট, প্রথম এবং দ্বিতীয় চলন পা পরিবর্তিত হয়ে ক্লাসপারে পরিণত হয় এবং জনন রন্ধ্রেও আকৃতি ভিন্ন। পূর্ণ জোয়ারের সময় এরা প্রজনন করে এবং তখন এরা কক্সবাজার, সোনাদিয়া, মহেশখালি এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপের নিকটে খাড়ি বা জলাভূমির বালুময় সৈকতে ফিরে আসে। সুন্দরবনের চর এলাকা হচ্ছে C. rotundiceuda এর প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র তবে অন্যান্য সকল উপকূলীয় এলাকায় উভয় প্রজাতিই প্রজনন করে।
C. rotndicauda বসন্তের শুরুতে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) কর্দমাক্ত সৈকতে এবং T. gigas গ্রীষ্মের শুরুতে (এপ্রিল-জুন) বালুময় সমুদ্র সৈকতে প্রজনন করে। প্রজনন কালে একটি স্ত্রী C. roturdicauda ২,০০০ থেকে ৩০,০০০ ডিম ছাড়ে; পুরুষ প্রাণীরা ডিমগুলোকে নিষিক্ত করে বালুর মধ্যে লুকিয়ে রাখে। C. rotundicauda এর ডিমের ব্যস ২.২৬-২.৪৮ মিমি এবং মরমধং এর ডিমের ব্যস প্রায় ৩.৫ মিমি। বড় ডিমের মধ্যে এদের লার্ভাগুলো ছোট লালচে গোলকের মতো দেখায় এবং বাচ্চা ফুটতে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে; অত:পর প্রায় ১৬ বার খোলস পরিবর্তনের মাধ্যমে এরা প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং যৌন পরিপক্কতা লাভ করে। প্রাথমিক অবস্থায় লার্ভাগুলোকে ট্রাইলোবাইটদের মতো দেখায় এবং তাই এদেরকে ’ট্রাইলোবাইট লার্ভা’ বলা হয়। লার্ভাগুলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর মতোই দেখায় তবে লেজ হ্রাসকৃত বা লুপ্তপায় অবস্থায় থাকে। এরা ১২-১৯ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
রাজ কাঁকড়া অথবা অশ্ব খুরাকৃতি কাঁকড়া মূলত জৈব আর্বজনা ভূক প্রাণী। এদের অধিকাংশই সমুদ্রের তলদেশের কাঁদার মধ্যে বসবাস করে এবং সেখানে তারা ছোট প্রাণী, পোকা-মাকড়, ক্রাস্টেশিয়ান, মোলাস্ক (জীবিত বাচ্চা ক্লাম) এবং এমনকি ছোট মাছ শিকার করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এরা প্রধানত নিশাচর। এদের প্রজনন স্বভাব অত্যন্ত চমৎকার। প্রজননকালে পুরুষ কাঁকড়া একটি স্ত্রী কাঁকড়া নির্বাচন করে এবং নখরযুক্ত প্রথম, ২য় এবং তৃতীয় চলন পা (ক্লাসপার) দ্বারা স্ত্রী কাঁকড়ার পিঠের উপর দীর্ঘসময় লেগে থাকে। স্ত্রী কাঁকড়া সেফালোথোরাক্সের সম্মুখ অংশ দ্বারা সমুদ্র সৈকতে ১৫-২০ সেমি গভীর একটি গর্ত (বাসা) তৈরী করে এবং গর্তের মধ্যে ডিম ছাড়ে। যা পরবর্তীতে পুরুষ কাঁকড়া নিষিক্ত করে। স্ত্রী কাঁকড়া ডিমগুলোকে বালু দ্বারা ঢেকে দেয় যাতে ডিমগুলো সূর্যের আলোকে তা দেওয়ার সময় সমুদ্রের ঢেউ থকে রক্ষা পায়। এরপর তারা গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়। এই নিশ্চল প্রাণীরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য কাদা বা বালুর মধ্যে গর্ত করে সময় কাটায়। এরা খুব অল্প সময়ের জন্য খাড়া হওয়া বা উল্টানোর জন্য টেলসন ব্যবহার করে। এরা অত্যন্ত সহিষ্ণু এবং সপ্তাহকালব্যাপী পানি এমনকি খাদ্য ছাড়া বাঁচতে পারে। তবে ফুলকা অবশ্যই ভিজা থাকতে হবে। এরা সমুদ্রের উষ্ণ, অগভীর উপকূলীয় অঞ্চল ও নদীমুখের ৩০ মিটার গভীরতায় বসবাস করে। তবে এরা যখন প্রজননের জন্য অগভীর পানিতে যায় এবং কাদাময়/বালুময় সৈকতে ডিম ছাড়ে তখন খুবসহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। যদিও সাধারণভাবে এরা সম্পূর্ণরূপে সামুদ্রিক প্রাণী তবে বাংলাদেশ এবং ভারতে এদেরকে নদীতে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বাচ্চা কাঁকড়া প্রায় ৭-৯ বছর কাঁদাচরে বাস করে যতক্ষণ না পর্যস্ত গভীর সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার পূর্বে দেহের দৈর্ঘ্য ১৫ সেমি হয়।
বাংলাদেশে C. rotundicauda মোহনা এবং মহাদেশীয় মহীসোপান অঞ্চলে দেখা যায় এবং প্রায়ই মাছ ধরার জালে ধরা পড়ে। কক্সবাজার উপকূল, সেন্টমার্টিন, সোনাদিয়া এবং মহেশখালি দ্বীপ এবং সুন্দরবনের নদী ও চরে সচরাচর এটিকে দেখা যায়। ঞ. মরমধং কক্সবাজার, টেকনাফের ইন্টারটাইডাল অঞ্চল এবং সের্ন্টমার্টিন দ্বীপে পাওয়া যায় তবে সুন্দরবনে দেখা যায় না।
এদের জীবন্ত জীবাশ্মও বলা হয়, কারণ ৪৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে এদের অস্তিত্ব ছিল। ডাইনোসরের চেয়েও প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল এই লিমুলাস। তাই এই জলজ প্রাণী বিজ্ঞানীদের কাছে আজও বিস্ময় ।
কাঁকড়ার এক লিটার রক্তের দাম ১১ লাখ টাকা
একটা কাঁকড়া। তার রক্তের দাম শুনলে চমকে যাবেন। এই অশ্বক্ষুরাকৃতি কাঁকড়াটির রক্তের দাম প্রতি লিটার ১৪ হাজার ডলার(বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা)।
এই কাঁকড়ার নীল রক্তই বহুমূল্য। রক্তের অসাধারণ ক্ষমতা বলে লিমিউলাস বা অশ্বক্ষুরাকৃতি কাঁকড়ারা যে কোনও ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।
➣ Competitive Exam. Geography MCQ
এদের রক্তের রঙ নীল কেন? বিজ্ঞানীরা জানান, মেরুদণ্ডী প্রাণীরা সাধারণত হিমোগ্লোবিনে লোহার উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রক্তে অক্সিজেন পরিবহণ করে থাকে। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আলাদা। এরা হিমোসায়ানিনের সাহায্যে অক্সিজেন পরিবহন করে। এতে তামার উপস্থিতির কারণে রক্তের রঙ নীল হয়।
এদের জীবন্ত জীবাশ্মও বলা হয়, কারণ ৪৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে এদের অস্তিত্ব ছিল। ডাইনোসরের চেয়েও প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল এই লিমিউলাস। তাই এই জলজ প্রাণী বিজ্ঞানীদের কাছে আজও বিস্ময়
বিংশ শতাব্দির প্রথম অর্ধাংশে আমেরিকায় রাজ কাকড়া সার এবং পশু খাদ্য তৈরীতে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত হতো। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন: থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ভিয়েতনাম এবং চীনে রাজ কাঁকড়ার ডিম সুস্বাদু খাবার হিসেবে ব্যবহূত হয় তবে পশ্চিমা বিশ্বে এদের রক্তের জন্য সংগ্রহ করা হয়। এদেরকে বাইম জাতীয় মাছ এবং শঙ্ক শামুক ধরতেও টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়্। এদের রক্তের এনজাইম ঔষধ এবং জৈবচিকিৎসা শিল্পে মানুষের জীবন রক্ষার্থে ইনট্রাভেনাস ড্রাগ এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রোসথেটিক গ্রুপের বিশ্বদ্ধতা পরীক্ষায় ব্যবহূত হয় এবং বর্তমানে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির এন্ডোটোক্সিন দূষণের পরীক্ষায় ও ব্যবহূত হয়।
সুন্দরবন এলাকার জেলেরা এর ফাঁপা লেজের টুকরা সূতার সাহায্যে হারের ন্যায় বানিয়ে ব্যথা নাশক (যেমন বাতজবেরর ব্যথা) হিসেবে ব্যবহার করে। দূষিত জায়গায় প্রাপ্ত কাঁকড়ার বিকৃত ভ্রুণ সামুদ্রিক দূষণ পরীক্ষায় জৈব নির্দেশক হিসেবে ব্যবহূত হয়। মহেশখালি এবং সোনাদিয়া দ্বীপের উপজাতীয় মগরা রাজ কাকড়ার প্রোটিন সমৃদ্ধ ডিম তেলে ভেজে খায়। মার্চ- মে মাসের দিকে পূর্নিমা রাতে যখন বালুর বাসা থেকে এদেও ডিম ফোটা লার্ভা ও জুভেনাইল বের হয়ে এসে সমুদ্রের দিকে দলে দলে রওনা দেয় সমুদ্র তীরের পাখিরা এদেও ধরে খাওয়ার উৎসবে মেতে উঠে। রাজ কাঁকড়া উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় জৈব-আবর্জনাভোজী বা সর্বভূক হিসেবে গুরত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপকূলীয় বাস্ততন্ত্রে কিছু অভিপ্রয়ানকারী এবং আবাসিক পাখি, বন্য শুকর (সুন্দরবনের), কাছিম, এবং মাছ (হাঙ্গর, ঈল, সি-বাস) এর ডিম, লার্ভা, জুভেনাইল এবং এমনকি সম্পূর্ণ প্রাণীকে শিকার করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে রাজ কাঁকড়ার স্বাস্থ্য মানুষ এবং পরিবেশের জন্য গুরত্বপূর্ণ নির্দেশক। T. gigas কক্সবাজারের কাদাচর এবং সুন্দরবনের উপকূল এলাকায় অনুপস্থিত থাকায় পরিবেশগতভাবে C. rotundicauda থেকে পৃথক।
বাংলাদেশে যদিও রাজ কাঁকড়া ঝুকিপূর্ণ নয়, তবে বিশ্বব্যাপী অতি আহরণ ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারনে আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে এর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় এদেরকে ঝুকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে।
প্রাগৈতিহাসিক এই প্রাণীর সহিত অমেরুদন্ডী প্রাণীর একটি বড় গ্রুপের সাদৃশ্য থাকায় এরা জাতিজনি (Phylogeny) এবং বির্তনের দিক থেকে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ উপকুলের পূর্ব অংশে প্রাপ্ত C. rotundicauda (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপ) সুন্দরবন অঞ্চলের একই প্রজাতির দেহের (বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূল) রঙ এবং গঠন ভিন্ন ধরনের। পূর্বাঞ্চলীয় রাঁজ কাঁকড়ার দেহের আকার, গোলাকার লেজ, পুরুষ প্রাণীর নখর উপাঙ্গ এবং ক্রোমোসোম সংখ্যার (৩২) সহিত এর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আদর্শ প্রজাতির মিল রয়েছে। তবে সুন্দরবনের রাঁজকাঁকড়া আদর্শ প্রজাতিটির চেয়ে বড় এবং প্রায় বঙ্গোপসাগরের T. gigas এর মতো বড়। সুন্দরবনের রাঁজ কাঁকড়ার উদরের পার্শ্বীয় কাটাগুলো আদর্শ C. rotundicarida (০.৮১ সেমি) এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত খাটো (০.৬৯ সেমি); সুন্দরবনের রাজ কাঁকড়া গাঢ় সবুজ অথবা সবুজাভ কালো অপরপক্ষে আদর্শটির রঙ বাদামী অথবা গাঢ় বাদামী। সুন্দরবনের রাজ কাঁকড়ার ক্যারাপেস অন্যান্যগুলোর চেয়ে পুরু এবং স্ফীত, বিশেষ করে উদরীয় অঞ্চল এবং এদের দেহের আকার আদর্শটির চেয়ে অধিক বৃত্তাকার। যদিও জীনতাত্ত্বিকভাবে এদের আনবিক গঠন এবং ক্রোমোজোম সংখ্যা সমান, তবে এদের অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য এবং ভৌগলিক অবস্থানের পার্থক্যের কারনে, সুন্দরবনের রাঁজকাঁকড়াকে C rolundicauda এর একটি উপপ্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে অথবা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনে এর উপস্থিতি হওয়ায় একে অন্তত ‘সুন্দরবন রাজ কাঁকড়া’ নামে অভিহিত করা উচিত। ➣ ভারতের নতুন উপকূলরেখা
কলমে : শিক্ষক উমাশঙ্কর মণ্ডল (ম্যানগ্রোভ ম্যান)
গ্রন্থপুঞ্জি : S.H. Chowdhury and A.K.M. Hafizuddin, Horseshoe crabs (Chelicerata: Merostomata) occurring along the Southeast coasts of Bangladesh. Bangladesh J. Zool. 8 (1): 5-13. 1980.
A. Christianus and P. Hajeb, The horshoe crab, a living fossil. Fish Mail. Malaysia Fisheries Society, 12 (4): 3-6. 2003. T. Itow,
J.K. Misra and A.T.A. Ahmed, Horseshoe crabs (King crabs) in the Bay of Bengal, South Asia, Shizuoka University. Bull. Fac. Educ., Nat. Sci. Seri. 54: 13-30. 2004.
চিত্র : চরঘেরীর চরে
বিদ্রঃ আপনার লেখা প্রবন্ধ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার জন্য 8640890159 এ Whats App করুন ।
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.