Misty of Green Tortoise
সবুজ কাছিম-এর রহস্য
রহস্যে মোড়া পৃথিবীর কত কিছুই আমাদের অজানা, আর এই অজানা বিষয় জানার আগ্রহ কার না নেই বলুনতো ? আমরা জানতে চাই, আরো বেশি জানতে চাই । হয়তো বা আমাদের জানার আকাঙ্ক্ষা নিবারণের জন্যই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌশলে কলম ধরেছেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে । এরকম বেশ কিছু রহস্যময় অজানা বিষয় নিয়ে প্রসূন দাস মহাশয় আমাদের উপহার দিয়েছে “আখ্যানে বিজ্ঞান” নামক বইটি । এই বইটি থেকেই নেওয়া হয়েছে সবুজ কাছিম-এর রহস্য [Misty of Green Tortoise] নামক আখ্যানটি ।
সবুজ কাছিম-এর রহস্য
প্রসূন দাস
প্রশ্নটা কদিন থেকেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল টকাই-এর। নাট-জিও চ্যানেলে সেদিন টকাই দেখল ব্রাজিল-এর সমুদ্রোপকূল থেকে প্রচুর সংখ্যায়
সবুজ সামুদ্রিক কাছিম কম বেশি দু হাজার কিলোমিটার রাস্তা সাঁতরে অ্যাসেনশন দ্বীপে ডিম পাড়তে যায়। অথচ এমন নয় যে কাছে পিঠে আর সমুদ্রের বালুকা বেলা নেই। বিপন্ন প্রজাতির এই কাছিমগুলোর বাসভূমি দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ছাড়াও প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর আর ভারত মহাসাগরের কিছু গ্রীষ্মপ্রধান ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপপুঞ্জের চারদিকে ছড়িয়ে। এরা থাকে সমুদ্রোপকূল ও খাড়ির অগভীর জলে যেখানে প্রচুর সামুদ্রিক ঘাস পাওয়া যায় যা কিনা এদের মূল খাবার। এ খাবার গভীর সমুদ্রে নেই। ফলে এই দীর্ঘ রাস্তা তাদের থাকতে হয় অভুক্ত। রাস্তাটা পার করতে সময় লাগে দু মাস, ফিরতে আরও কিছু। এবং আটলান্টিক-এর জল-স্রোত উত্তর থেকে দক্ষিণে অথচ এদের সাঁতার দিতে হয় এর বিপরীতে। যাওয়ার পথে পড়ে কত জল-নিমগ্ন পাহাড় বা ডাঙা যা এড়িয়ে যেতে হয়। এসব করে যদিবা পৌঁছানো গেল ঐ দ্বীপে, দেখা গেল যেখানে হাজির হল সেখানটায় হয়ত খাড়া পাথরের পাড়। সুতরাং ডাইনে বাঁয়ে খুঁজতে হবে বালির পাড়। অ্যাসেনশন দ্বীপটিতে আছে সাতটা ছোট্ট বেলা ভূমি। সেখানে এরা গর্ত খুড়ে ডিম পাড়ে। এরপর ফিরে যায় তাদের নিজের বাসভূমিতে।
ঘটনাটা দেখার পর থেকে টকাই-এর মনে এর কারণানুসন্ধান চেপে বসেছে। গুগল-এ তেমন কিছু পেল না। টকাই-এর কাছে এটা কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না যে কাছের জায়গা ছেড়ে ডিম পাড়তে ঐ ব্রাজিলের সবুজ সামুদ্রিক কাছিমগুলো অত অত দূরে কেন যাবে। অগত্যা ভরসা সেই বাবা যাকে কিনা পাওয়াই মুশকিল।
তন্ময় অফিসের কাজে ট্যুরে গেছে। ফিরতে আরও তিন চার দিন লাগবে। দাদু এমনিতে বয়স হলে কি হবে পড়াশুনার ব্যাপারে টকাইকে আর তার দিদি টুম্পাকে রীতিমত গাইড করেন। কিন্তু তিনি আপাতত টকাই-এর কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পারলেন না। মা তনিমার গ্র্যাজুয়েশান হিউম্যানিটিস-এ হলেও বিজ্ঞানে যথেষ্ট কচি, আর নানা রকম বিষয়ে আগ্রহও প্রচুর। কিন্তু মা-ও বিশেষ কাজে লাগল না। তবে টকাই-এর মত তার মা-ও খুব কৌতূহলী হয়ে পড়ল ব্যাপারটায়। রাতের ডিনার টেবিলে টকাইকে অন্যমনস্ক দেখে তনিমা ঠিক করল আজ তন্ময়-এর সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবে। এমনিতে বাইরে থাকলে তন্ময় রোজ রাতে একবার ফোন করে বাড়ির সবার খবরাখবর নেয়। সেদিন যখন ফোনটা এলো তখন তনিমা বলল –
দাঁড়াও, আগে একটু টকাই-এর সাথে কথা বল। একটা প্রশ্ন নিয়ে আজ কদিন ওর এমন অবস্থা যে আজ রাতে ভাল করে খায়নি পর্যন্ত। আমি, বাবা সবাই ফেল, এখন তুমি কবে ফিরবে সে অপেক্ষায় বিমর্ষ।
তন্ময় জানে টকাই-এর নানা বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ। এই আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে তার নিজের যেমন চেষ্টা আছে তেমনই তার স্ত্রী ও বাবাও খুব উদ্যোগী। টকাই দাঁত মেজে শোয়ার জন্য তৈরি হয়ে শরদিন্দুর একটা গোয়েন্দা কাহিনীর বই নিয়ে বিছানার দিকে যাচ্ছিল। একতলা থেকে মার ডাক শুনে যাই মা বলে নীচে গিয়ে শোনে বাবার ফোন। মার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে সরাসরি কাজের কথায়- বাবা একটু বলতো এই ব্রাজিল-এর সবুজ সামুদ্রিক কাছিমগুলো ডিম পাড়ার জন্য এত কষ্ট করে দু হাজার কিলোমিটার দূরে অ্যাসেনশন দ্বীপে কেন যায়? এমনিতেই দেখলাম ওরা বিপন্ন প্রজাতি, তার মধ্যে না খেয়েদেয়ে এত বাধা অতিক্রম করে ওদের মরতে মরতে এত দূরে যাওয়ার কী কারণ?
শোন তোর এই প্রশ্নটার কোনও সংক্ষিপ্ত উত্তর হয় না। এর সাথে জড়িয়ে আছে দুটো বিষয়। এক পৃথিবীর, বিশেষ করে ভূপৃষ্ঠের বিবর্তন। দুই এই বিশেষ কাছিমের বিবর্তন। কিন্তু এত কথা ফোনে বলা সম্ভব নয়। আমি পরশু ফিরছি, তখন কথা হবে। ঠিক আছে?
হ্যাঁ, অল্প একটু ঠিক আছে।
কেন? অল্প কেন?
কারণ বুঝলাম যে আমার প্রশ্নের উত্তর পাব কিন্তু আপাতত দু দিন সাসপেন্সে থাকতে হবে। নাও মা-র সাথে কথা বল। এক গাল হেসে মা-কে ফোনটা দিয়ে ঘরের দিকে দৌড় দিল টকাই। তনিমা বুঝল যে আপাতত ছেলের মনের ভারটা নেমেছে।
শনিবার বিকেলে তন্ময় কলকাতা ফিরল। বাড়ি পৌঁছোতে সন্ধে। বাবাকে ট্যাক্সির দরজা থেকে পাকড়াও করল টকাই। স্মিত হেসে তনিমা বলল বাবাকে অন্তত ঘরে তো ঢুকতে দে। ছেলেকে একটু আদর করে তন্ময় ব্যাগেজ নিয়ে ঘরে ঢুকল। জুতো খুলতে খুলতে টুম্পার খোঁজ করল। বাবার সাথে দেখা করে বেরিয়ে, স্নান করে চা খেতে খেতে স্ত্রীর সাথে টুকটাক বিষয় নিয়ে কথা হল। কিন্তু চা শেষ হওয়া মাত্র উঠে পড়ল তন্ময়। তনিমা জানে এখন টকাই-এর সাথে বসবে। কিন্তু সে নিজেও একই রকম আগ্রহী। এ কারণে বিকেলের কাজ কর্ম একরকম শেষ করেই রেখেছে। ইতিমধ্যে টুম্পাও ফিরেছে তার গানের ক্লাস থেকে। তন্ময় বলল- চল সবাই বাবার ঘরে গিয়ে বসি। বাবা, মানে সুধাংশুবাবু, এ ধরনের আলোচনায় খুব আগ্রহের সাথে অংশ নিয়ে থাকেন।
সুধাংশুবাবু ইজিচেয়ারে বসে তপন রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্রহ পড়ছিলেন। সব দল বেঁধে ঘরে ঢুকতে পেজ মার্কার দিয়ে বইটা বন্ধ করে সরিয়ে রাখতে রাখতে বললেন-আজ তাহলে আমরা কাছিম কাহিনী শুনব।
টুকাই বলে উঠল – না দাদা, আমরা আদিম কাহিনী শুনব।
সে কি? তুই যে কাছিম নিয়ে মাথা খাচ্ছিলি?
ঠিক। সেটাই। কিন্তু বাবা বলেছে এর সাথে জড়িয়ে আছে পৃথিবী এবং কাছিমের বিবর্তন।
সুধাংশু বাবু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন ছেলের দিকে। তন্ময় হেসে বলল- হ্যাঁ বাবা।
বেশ। শুরু কর তাহলে।
সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিছানা, সোফা, চেয়ার-এ বসলে, তন্ময় শুরু করল-
পৃথিবীটা বা আরও সঠিক ভাবে বলতে গেলে ভূপৃষ্ঠটা আজ আমরা যেমন দেখছি চিরকাল এমনটা ছিল না। অর্থাৎ এই মহাদেশ বা বিভিন্ন সমুদ্র আজ যেমন, তখন তেমন ছিল না। তখন আলাদা করে অ্যাফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বলে কোনও ভূখন্ড ছিল না। একটা বিশাল ভূখণ্ড ছিল যাকে আজ আমরা বলি প্যাঙ্গিয়া। নামটা এসেছে একটা গ্রীক শব্দ থেকে যার মানে হচ্ছে ‘গোটা পৃথিবী’। আর এই ভূখন্ডকে ঘিরে রেখেছিল যে জল তাকে আমরা বলি প্যান্থালেসা। এটারও গ্রীক অর্থ ‘গোটা সমুদ্র’। সময় ধরে আমরা যদি পিছিয়ে যাই, তাহলে এটা হচ্ছে সাতাশ থেকে তিরিশ কোটি বছর আগের কথা।
কিন্তু বাবা, এতদিন আগের কথা জানা গেল কি করে প্রশ্ন টকাই-এর।
গুড কোয়েশ্চেন। কিন্তু আর একটু শুনে নে তারপর তোর প্রশ্নে আসছি। তো এই অব্দি শুনে তোদের মনে হতে পারে যে পৃথিবী তার সৃষ্টির শুরুতে যখন ঠান্ডা হতে শুরু করল তখন থেকেই বুঝি এই প্যাঙ্গিয়া আর প্যান্থালিসা ছিল। বলে রাখি যে তা কিন্তু নয়। এই মতটা এখন অনেকেরই যে পৃথিবীর ইতিহাসে ভূপৃষ্ঠের এই মাটির টুকরোগুলো যাকে আমরা দেশ, মহাদেশ বলি তারা বারবার জোড়া লেগেছে আবার আলাদা আলাদা টুকরো হয়ে গেছে। আলাদা হয়ে যাওয়ার সময় অবশ্যই আবার যে যার আগের চেহারাতেই ফিরে যায় নি। টুকাই পৃথিবীর বয়স কত?
সাড়ে চারশো কোটি বছর দ্রুত উত্তর এল টুম্পার কাছ থেকে। বোঝা ছে ব্যাপারটায় টুকাই-এর মত টুম্পাও মগ্ন হয়েছে।
ঠিক। তো এই সাড়েচারশো কোটি বছরের মধ্যে পৃথিবীর পঞ্চাশ কোটি বছর লেগে গেল খানিক ঠান্ডা হতে যাতে এই গোলকটার উপরে সরের মত একটা কঠিন আস্তরণ পড়ে যেটাকে আমরা ক্রাস্ট বলি। এটাই হল আমাদের ভুপষ্ঠের আদিম বা প্রথম নীচে তিরিশ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার পুরু। সেই থেকে ভূপৃষ্ঠের ভাঙা গড়া চলছে চেহারা। এই ক্রাস্ট সমুদ্রের নীচে পাঁচ থেকে দশ কিলোমিটার আর মহাদেশগুলের চক্রাকারে। আমাদের প্যাঙ্গিয়া হল শেষতম জোড়া লাগা চেহারা।
একটু দাঁড়া বাবা সুধাংশুবাবু তন্ময়কে থামালেন বৌমা আমার প্রেশারের ওষুধটা একটু দাও না। তন্ময় এই ফাঁকে কারও সাথে একটা ফোন সেরে নিল।
তন্ময় আবার শুরু করল-
হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। এই ক্রাস্ট তৈরি হওয়ার পর মোটামুটি সাড়ে তিনশ থেকে চারশো কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হল। সত্যি কথা বলতে কি অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমে চারশো দশ কোটি বছরের পুরনো একটা পাথরের মধ্যে জীবনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। সে যাই হোক। প্রকৃতিতে ভাঙা গড়া চলতে থাকল। একদিকে ভূপৃষ্ঠের চেহারা বদলাচ্ছে অন্যদিকে প্রাণে অর্থাৎ প্রাণী জগতে চলছে বিবর্তন। আমাদের প্যাঙ্গিয়া যখন তৈরি হয়েছে তখন পৃথিবীর মাটিতে এসে গেছে ডাইনোসর। এবং এই সামুদ্রিক কাছিম। আরও এসেছে আরশোলা যা দেখে টুম্পা ভয় পায়। ডাইনোসর শুনেই টকাই একটু নড়ে চড়ে বসল। বলে উঠল তারপর?
যেহেতু সমস্ত ডাঙ্গাটাই একসাথে ছিল তাই ডাইনোসরেরা সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াতে পারত। এরপরে আজ থেকে প্রায় কুড়ি কোটি বছর আগে প্যাঙ্গিয়া ভাঙতে বা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল। প্রকৃতির এই ভাঙা গড়া একটা খুব ধীর লয়ে চলে। কোনও তাড়াহুড়ো নেই। তাই প্যাঙ্গিয়াও রাতারাতি সবটা একসাথে আলাদা হয়ে গেল না। প্রায় চোদ্দ কোটি বছর আগে অ্যাফ্রিকা আর দক্ষিণ অ্যামেরিকা আলাদা হতে শুরু করল আর তাদের মাঝখানে জন্ম নিতে থাকল দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক। এই দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকেই রয়েছে সেই অ্যাসেনশন দ্বীপ যেখানে টকাই-এর কাছিম ডিম পাড়তে যায়। শুরুতে দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক এত বিশাল ছিল না। ছিল নদীর মত সঙ্কীর্ণ একটা সমুদ্র। একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে- মহাদেশ হোক বা সমুদ্র- এরা সবাই কিন্তু ঐ ক্রাস্টের মধ্যেই আছে। আর এই ক্রাস্ট একটা বিরাট ডিমের খোলার মত যাতে প্রচুর ফাটল। যার এক একটি টুকরো অতি বিশাল। সংখ্যায় এরা বারো থেকে কুড়িটা হতে পারে। এই এক একটা টুকরোকে আমরা বলি প্লেট। প্লেটগুলো আমাদের গ্রহের সাথে দৃঢ় ভাবে প্রোথিত নেই। তারা ভাসমান এবং চলন্ত। চলতে চলতে এই প্লেটগুলোর যখন একের সাথে অন্যের সঙ্ঘর্ষ হয় তখনই আমরা ভূকম্পন অনুভব করি। ক্রাস্ট ভেঙে কেন টুকরো হল আর টুকরোগুলো চলে ফিরে বেড়ায়ই বা কেন এটা ভূতাত্ত্বিকেরা খুব নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তবে ক্রাস্টের তলায় রয়েছে ভীষণ গরম ম্যান্টল। আর এই গরম ম্যান্টল-এর কারণে এই চলন হতেও পারে। তবে এই চলন নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। ভূতত্ত্বে প্লেট-এর এই চলন ‘প্লেট টেকটনিক্স’ নামে পরিচিত।
টকাই জানতে চেয়েছিল এতদিন আগের এসব ঘটনা জানা গেল কি করে? দু একটা কথা বলি- এক, ভারতবর্ষের দক্ষিণে যে বেলে পাথর পাওয়া যায় তার সাথে হুবহু মিল রয়েছে মাদাগাস্কারে পাওয়া বেলে পাথরের। অথচ এই দুই দেশের মাঝে রয়েছে সুবিশাল ভারত মহাসাগর। গোয়েন্দার মন নিয়ে দেখলে অনুমান করা যায় এ দুটি স্থলভাগ একসময় পাশাপাশি ছিল, পরে আলাদা হয়েছে।
দ্বিতীয় উদাহরণটি এরকম- তুলনামূলকভাবে ভূতত্ত্ব হল বিজ্ঞানের একটা নূতন শাখা। এ ব্যাপারে দুটো নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে। আধুনিক ভূতত্ত্বের জনক হিসেবে স্কটিশ প্রতিভা জেমস হাটন। আর দ্বিতীয় জন হলেন জার্মান বিজ্ঞানী আলফ্রেড ওয়েগনার। ওয়েগনার-এর কথায় এই চলনের ধারনাটা তার প্রথম মনে হয় যখন তিনি লক্ষ্য করেন যে দক্ষিণ অ্যামেরিকার পূর্ব উপকূল আর অ্যাফ্রিকার পশ্চিম উপকূল-এর গঠন এমন যে পাশাপাশি রাখলে জিগস-পাজল-এর মত একদম মিলে যাবে দুটো তট।
তৃতীয়ত তিনি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন দক্ষিণ অ্যাফ্রিকার পূর্ব থেকে পশ্চিম অভিমুখী একটা পর্বতমালার সাথে অ্যাটলান্টিকের অপর পারে আর্জেন্টিনার একটা পর্বতমালার। ঠিক যেন একটাই পর্বতমালা মাঝখান দিয়ে কেটে দেয়া হয়েছে।
চতুর্থত – ব্রাজিল-এর একটা মালভূমি কি অদ্ভুতভাবে অ্যাফ্রিকার আইভরি কোস্টের একটা মালভূমির পরিপূরক।
এছাড়াও আরও অনেক আছে। এইতো আমাদের ঘরের পাশে এভারেস্টের মাথায় ভর্তি রয়েছে সমুদ্রের নীচের জীবাশ্ম। অর্থাৎ এই এভারেস্টের মাথাটা সমুদ্রতলের সামগ্রী দিয়ে তৈরি। কি টকাই তোর উত্তর পেলি? সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়েও টকাই বলল – এবার কাছিম-এর ব্যাপারটা।
হ্যাঁ। দেখ ব্যাপারটা এরকম। দক্ষিণ অ্যামেরিকার জঙ্গলে প্রচুর জাগুয়ার আছে। এক একটা সবুজ সামুদ্রিক কাছিম লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট আর ওজনে দুশো থেকে তিনশো কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ডিম পাড়তে আসা বা রোেদ পোয়াতে আসা কাছিম প্রায়ই জাগুয়ারদের হাতে মারা পড়ে। এছাড়া কুকুর থেকে পাখি প্রায় সব মাংসাশী প্রাণীই কাছিমের পেড়ে যাওয়া ডিম বালি খুঁড়ে খেয়ে ফেলে। তাই ব্রাজিলে শত শত একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে নেয়াটা একদম স্বাভাবিক। প্যাঙ্গিয়া যখন ভাঙতে শুরু মাইল সুন্দর বালির তট থাকা সত্ত্বেও বংশধারা বজায় রাখার তাগিদে কাছিমগুলোর করেছে তখন আজকের এই কাছিমদের প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা, মানে আসলে মায়েরা, দক্ষিণ অ্যামেরিকার তট থেকে ঝামেলা এড়াতে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে এরকম নিরিবিলি, নির্জন আর হামলাকারীবিহীন দ্বীপ বেছে নিয়েছিল। তখন এ জায়গা বাসস্থান থেকে বেশি দূরে ছিল না। ধীরে ধীরে যেমন দক্ষিণ অ্যামেরিকা দূরে সরে যেতে থাকল, এই দ্বীপের দূরত্ব বাড়তে থাকল। কিন্তু এই পরিবর্তনটা এত ধীর যে এক প্রজন্মের কাছিম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছিম প্রায় টেরই পেত না। কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর ধরে দ্বীপটা একটু একটু করে দূরে যাচ্ছে আর কাছিমেরাও ঐ দূরত্বে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। সত্যি বলতে কি এই যাত্রা তাদের মধ্যে একটা পরিবর্তনও এনে ফেলেছে। এত কঠিন রাস্তা শুধু তারাই পার হতে পারে যারা সব থেকে সমর্থ। আর তাদের পাড়া ডিম থেকে বাচ্চার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যেহেতু বেশি হচ্ছে, সুতরাং কাছিমদের মধ্যে ক্রমশই অধিক সমর্থদের সংখ্যাই হয়ে উঠছে বেশি। আজকের সবুজ সামুদ্রিক কাছিমের কাঁধের মাংস পেশী বিশাল এবং শক্তিশালী যাতে টানা সাঁতার কাটা যায়। তারা শরীরে প্রচুর চর্বি জমা করতে পারে যাতে এই দীর্ঘ পথের অনাহারের সময় ঐ চর্বি তাদের শক্তি যোগান দিতে পারে। এমন কি তাদের অস্থির গঠনেরও পরিবর্তন হয়েছে। কাজেই বুঝলি টকাই অত দূরে যেতে হলেও তার জন্য ওরা শারীরিক দিক দিয়ে সম্পূর্ন প্রস্তুত। আর হ্যাঁ বোঝাই যাচ্ছে এত লক্ষ বছরে ওদের ডিএনএ-তেও পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছে যার দরুন এটা ওরা আর কষ্টকরও মনে করে না। বোঝা গেল?
টকাই বলল – হ্যাঁ বুঝেছি। কিন্তু ঐ প্লেট, ভূমিকম্প এসব যেন আরও কিছু জানার আছে।
ঠিক বলেছিস, তবে কিনা রাত হলে খেতে টেতে হয়তো, ওসব না হয় আর একদিন হবে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলো চলো সব খেতে চলো- তনিমা তাগাদা লাগাল – বাবা আপনাকে ঘুমের ওষুধটা দিই? ➣ পড়ুন : সিন্ধু জল চুক্তি
**********
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
