Secret of Terror Castle
সিক্রেট অফ টেরর ক্যাসল্
সাহিত্য হল সমাজের দর্পণ । সমাজ জীবনের টুকরো টুকরো তথ্যকে লিখনী নামক সুতোয় গেঁথে পাঠকের কাছে পৌঁছে পৌঁছে দেয় সাহিত্য কর্ম । সাহিত্য কাঁদাতে পারে, পারে হাসাতে আবার সাহিত্য পাঠের মাধ্যমেই ভাষাগত জ্ঞান পূর্ণতা পায় । বাংলার সাহিত্যের আনাচে-কানাচে পড়ে রয়েছে সাহিত্যরুপি অনেক মণি-মুক্ত । অনেক স্রষ্টার অনেক সৃষ্টি । আমাদের লক্ষ্য সেই সমস্ত মণি-মানিক্যের সম্ভারকে পাঠকের কাছে তুলে ধরা । স্রষ্টার সৃষ্টি ও আধুনিক সময়ের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে পাঠককে উৎসাহিত করে সাহিত্য পাঠে আগ্রহী করে তোলা । সেই উদ্দেশ্যেই বৈঠকি সাহিত্য বিভাগে এখন থাকছে Secret of Terror Castle [সিক্রেট অফ টেরর ক্যাসল্] ।
সিক্রেট অফ টেরর ক্যাসল্
উৎস : হিচকক রচনা
[১]
জলের ভিতর একটা অদ্ভুত আকৃতির মাছ ভাসছে। বব মাছটাকে দেখতে দেখতে তার হাতের একটা আঙুল এবার ছোঁয়ালো মাছের চোখের ওপর। আশ্চর্য দরজাটা খুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। ভিতরে ঢুকল বব।
এখানে জুপিটারের কাজকর্মের কিছু সাজ-সরঞ্জাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বাড়ির এই অংশটা যে জুপিটারের গোপন ওয়ার্কসপ তা ববের জানা। বব কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সামনের একটা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়লো।
তার প্রথমেই চোখে পড়ল জুপিটার জোন্সকে। খুব গম্ভীর হয়ে বসে আছে জুপিটার।
সম্ভবতঃ কোনও একটা ব্যাপার নিয়ে সে গভীরভাবে চিন্তামগ্ন। দাঁত দিয়ে ক্রমান্বয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে চলেছে একভাবে। জুপিটার চিন্তা করার সময় এইভাবে দাঁত দিয়ে তার ঠোঁট কামড়ায়, এসব ববের অবশ্যই জানা।
একসময় জুপিটার মাথা তুলে বললো-আমার কাছে এই মুহূর্তে একটা খবর আছে, মিঃ আলফ্রেড মিঃ হিচকক নাকি তার পরবর্তী ছবির জন্য একটা ভূতুড়ে বাড়ির সন্ধান করছেন। আমরা তাঁকে এই বাড়ির খোঁজখবর করে দিতে পারি।
জুপিটারের কথা পিটের খুব একটা পছন্দ হল না। সে চটপট উত্তর দিল-দূর, এটা একটা স্রেফ বাজে কাজ। মিঃ হিচককের আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, তিনি তার ছবির জন্য ভূতুড়ে বাড়ির খোঁজ করবেন। এর জন্য তার নিজের স্টুডিওই তো যথেষ্ট।
বব কিন্তু পিটের এই কথায় খুব একটা পাত্তা দিল না। বরং বললো-ভূতুড়ে বাড়ি, তো তুমি এই ব্যাপারটা কি ভাবে সমাধান করতে চাও, জুপ।
আমরা তদন্ত করব। খুঁজে বেড়াব। আর খুঁজে পাবার পর তা জানাব মিঃ হিচকককে।
তাতে আমাদের লাভ কি হবে!
লাভ এই যে তিনি আমাদের এজেন্সির নাম ছবিতে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে বিশেষভাবে উল্লেখ করবেন, যা আমাদের এই সংস্থার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে খুবই দরকার। আর তাহলে বুঝতেই পারছো রাতারাতি আমরা এই তিন গোয়েন্দা কতখানি জনপ্রিয় হয়ে যাব এই কাজের জন্য!
বব এবার জুপিটারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, কথাটা তুমি মন্দ বলনি।
এই কাজের সাফল্য আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপকে অনেকখানি এগিয়ে দেবে-জুপিটার এবার গম্ভীরভাবে বললো, একটা কথা তোমাদের বলে রাখি কাজে সফল না হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন ঘুনাক্ষরে আমাদের এই কাজের কথা জানতে না পারে।
জুপিটার পরম বিজ্ঞের মত নিজের চেয়ার থেকে শরীরটা সামান্য সামনের দিকে এগিয়ে এনে বললো-আগামীকাল সকালে আমরা হলিউডে যাত্রা করব, মিঃ হিচককের সঙ্গে দেখা করতে। টেলিফোনে তার সঙ্গে কথা না বলে তাঁর বাড়িতে যাওয়াটাই ভালো।
বব তোমার বোধহয় কাল লাইব্রেরীতে ডিউটি আছে। ঠিক আছে, আমি আর পিট যাবো কি রাজি তো পিট?
কেন রাজি হব না। অবশ্যই আমি রাজি হব।
জুপিটার খুশি হল পিটের কথা শুনে। বললো, তাহলে সেই মত তৈরি হয়ে কাল ঠিকসময়ে চলে এস। আমি বরং ইতিমধ্যে অটো রেনটাল-এজেন্সিকে টেলিফোনে গাড়িটা পাঠিয়ে দিতে বলবো। কাল থেকেই তো গাড়িটা একমাসের জন্য আমার পাওয়ার কথা আছে।
দারুণ। পিট বেশ উৎসাহ বোধ করলো।
জুপিটার বললো, আমরা কাল ঠিক সাড়ে দশটায় এখান থেকে বেরুবো। গাড়িটা সেইমত পাঠাতে বলছি তাহলে পিট।
নিশ্চয়ই।
এবার ববের দিকে তাকালো জুপিটার। কিছু বলবে?
হ্যাঁ। শোনো তোমার একটা জরুরী কাজ আছে। সকালে লাইব্রেরিতে পৌঁছে তোমার প্রথম ও প্রধান কাজ হবে পুরনো কাগজপত্র, আর ম্যাগাজিনের পাতা ঘেঁটে আমাদের কাজের সুবিধার জন্য সংবাদ জোগাড় করা।
কথাটা বলেই জুপিটার একটা তাদের পরিচয়পত্র ছাপানো কার্ডের ওপর কলম দিয়ে খস খস করে কি যেন লিখলো তারপর এগিয়ে দিল কার্ডটা ববের দিকে। বললো, যাতে তোমার ভুল না হয় সেইজন্যে লিখে দিলাম। আর মনে হয়, তোমার পক্ষে ক্যাটালগ দেখে ব্যাপারটার খোঁজ করাও সহজ হবে।
বব এবার তাকাল কার্ডটার দিকে। ছাপা কার্ডের অন্যদিকে জুপিটারের হাতে লেখা-ভয়ঙ্কর দুর্গ। বব কার্ডটা পকেটে রাখতে রাখতে বললো, ভালোই করেছো লিখে দিয়ে।
….জুপিটার ববকে সতর্ক করে দিয়ে বললো আমরা তিনজন তদন্তকারী, যে যার কাজ বুঝে নিয়েছি। এবার বলি আমরা সবসময় আমাদের পরিচয় পত্রের কার্ডটা আমাদের কাছেই রাখবো। এখন থেকে ওটা কাছে থাকলে, আমরা সবসময় আমাদের কাজ সম্বন্ধে সচেতন থাকতে পারবো। আর একটা কথা, জুপিটার নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো এখন থেকে আমরা আমাদের নামের বদলে ওই বিশেষ সাংকেতিক চিহ্নটাই ব্যবহার করবো। মনে থাকবে তো?
ধন্যবাদ।
কাল সকাল থেকেই তাহলে আমাদের কাজ শুরু হচ্ছে।
হ্যাঁ।
তাহলে এখন আমরা সভা ভাঙতে পারি। আবার কাল সকালে দেখা হচ্ছে-ঠিক দশটায়।
সকাল দশটায় জোন্স স্যালভেজ ইয়ার্ডের ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালো ভারি সুন্দর দেখতে একটা রোলস রয়েস গাড়ি।
গাড়িটা ফটকের সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্র জুপিটার আর পিট এগিয়ে গেলো। এতক্ষণ তারা এই গাড়িটার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ওদের দুজনের পরণেই সুন্দর পোশাক। ঝকঝকে সাদা স্যুট, গলায় টাই ঝুলছে। কেতাদস্তুর সাজে অপূর্ব দেখাচ্ছে জুপিটারকে।
জুপিটার দৃঢ়পদক্ষেপে এগিয়ে গেল গাড়িটার দিকে। তার পিছনে পিছনে পিটার।
গাড়ির সামনে দাঁড়ানো মাত্র দরজা খুলে দিল সাদা পোশাকধারী ড্রাইভার। জুপিটার তাকালো তার দিকে। চাউনিতে তার প্রখর দৃষ্টি। কাছে এসে সে বিজ্ঞভরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো চালকের দিকে। তার দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার লোকটি মাথার টুপি খুলে নিজের পরিচয় দিয়ে বললে-
আমার নাম মিঃ ওয়ার্দিংটন!
ধন্যবাদ। একটু থেমে জুপিটার গাড়িতে উঠতে উঠতে বললো, শোনো মিঃ ওয়ার্দিংটন, এখন থেকে তুমি আমাকে জোন্স না বলে জুপিটার বলে ডাকবে, ওই নামে সবাই আমাকে চেনে।
ঠিক আছে, তাই-ই হবে।
জুপিটার গাড়িতে ওঠামাত্র তার সঙ্গে সঙ্গে পিটও উঠে পড়লো ঐ গাড়িতে। গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে ওয়ার্দিংটন এবার নিজের জায়গায় বসে বললো এখন কোথায় যেতে হবে স্যার। তিরিশ দিনের জন্য এই গাড়িসহ আমি হলাম আপনার আজ্ঞাবহ।
শোনো ওয়ার্দিংটন, আমার কতকগুলো জরুরি কাজ আছে। খুব তাড়াতাড়ি ওসময় তো আমাদের সব কাজ করতে হয়। তোমার জন্য অপেক্ষা করার মতো সময় আমি তোমাকে দিতে পারবো না, তাই এবার থেকে খবর পাওয়া মাত্রই চলে আসবে, বলা থাকলো।
খুব ভালো কথা স্যার। বলুন এখন কোথায় যেতে হবে? জুপিটার এবার তাকালো ওয়ার্দিংটনের দিকে। একটু নীরব থাকার পর বললো-তোমাকে এখনো আমার কিছু বলার আছে। বিশেষ করে একটা ব্যাপার তোমাকে জানাতে চাই-তা হলো আমি আর দশজনের মত গাড়িটা নিয়ে স্ফূর্তি করার জন্য ব্যবহার করবো না। আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে নিয়েছি, তাই গাড়িটাকে আমি সেই কাজেই ব্যবহার করবো।
জুপিটারের কথায় ড্রাইভার লোকটি এবার খুব অবাক হলো। বিস্মিত চোখে জুপিটারের দিকে তাকিয়ে বললো, তা এখন আপনাদের কোথায় নিয়ে যেতে হবে?
অবশ্যই বলবো। আর শোনো, আমাকে তুমি এখন থেকে অতিরিক্ত কোন প্রশ্ন করবে
না। যতটুকু তোমাকে বলবো, ঠিক ততটুকু জানার চেষ্টা করবে।
তাই হবে স্যার।
এবার জুপিটার তার কণ্ঠস্বরকে গাঢ় করে বলল, এখন আমরা মিঃ আলফ্রেড হিচককের বিশ্ববিখ্যাত সেই হলিউড স্টুডিওর দিকে যেতে চাই।
খুব ভালো স্যার।
ওয়ার্দিংটন গাড়ি স্টার্ট করে দিল। ভারি অদ্ভুত ধরনের গাড়ি এটা, গাড়িটার বেশিরভাগ অংশ সোনার পাত দিয়ে মোড়া। বিশেষ করে গাড়িটার বডি, দরজা, জানলার ফ্রেম সবকিছু। তাছাড়া গাড়িটা আকারেও বেশ কিছুটা বড়। সব রকম ব্যবস্থাই আছে গাড়িটার মধ্যে। এই গাড়িটাকে অটো কোম্পানি যে বিজ্ঞাপনের জন্য সাধারণতঃ ব্যবহার করে থাকে তা বেশ বোঝা যায়। তবে গাড়ির মডেল খুবই পুরনো ধরনের। বিশেষ করে সামনের হেডলাইট দুটো পুরনো দিনের স্বাক্ষরই বহন করছে।
সোনায় মোড়া গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে ড্রাইভার ওয়ার্দিংটন কাঁধের ওপর থেকে ঈষৎ ঘাড় ঘুরিয়ে জুপিটারকে বললো-এই গাড়ির মধ্যে একটা টেলিফোন ও ছোট্ট রিফ্রেশমেন্ট রুম আছে, প্রয়োজন মত ব্যবহার করতে পারবেন।
ধন্যবাদ। অস্ফুট স্বরে জবাব দিল জুপিটার। তারপর নিজের জায়গা থেকে উঠে গিয়ে টেলিফোনটা খুঁজে বার করলো। ভারি অদ্ভুত ধরনের টেলিফোন। কোনরকম ডায়াল প্লেট নেই, কেবলমাত্র একটা সোনার বোতাম আছে, যা টিপলেই অন্যপ্রান্ত থেকে শোনা যাবে
অপারেটরের কণ্ঠস্বর। জুপিটার ভালোভাবে লক্ষ্য করলো।
পিট অবাক হয়ে অস্ফুট স্বরে বললো-ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো, একটা বোতাম টেপাতেই কাজ হবে?
হ্যাঁ। মোবাইল টেলিফোনের এটাই নিয়ম। একটু হেসে জুপিটার বললো, ভালোই হলো জানা থাকলো টেলিফোনের কথা। প্রয়োজনে কাজে লাগবে। কথা বলে আবার তারা এসে বসলো নিজেদের জায়গায়।
তীব্র গতিতে পাহাড়ি সরু সর্পিল রাস্তা ধরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে তখন রোলস রয়েস।
বাইরের দিকে তাকিয়েছিল পিট। জুপিটার নিজের জায়গায় অর্ধশায়িত। আধবোঁজা চোখে সে মনে হয় কিছু একটা গভীরভাবে ভাবছিল নিজের মনে।
একসময় জুপিটারের নজরে পড়ল বিরাট একটা প্রাচীর ঘেরা জায়গা, অনেক উঁচুতে একটা সাইনবোর্ড। তাতে লেখা আছে-ওয়ার্ল্ড স্টুডিও।
রাস্তার ধার ঘেঁসে পাঁচিল চলেছে। জুপিটার লক্ষ্য করলো বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে পাঁচিলটা ঘেরা। একসময় ধীরে ধীরে বড়ো লোহার একটা গেট তার চোখে পড়লো। গেটের দিকে এগিয়ে চলেছে রোলস রয়েস।
এতক্ষণ নির্বিঘ্নে গাড়ি ছুটছিল। বড়ো গেট পার হয়ে যাওয়ার মুখে প্রথম বাধা পেল রোলস রয়েস।
এক মিনিট দাঁড়াবেন স্যার।
গাড়ির গতি কমিয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালো ওয়ার্দিংটন।
কি ব্যাপার?
কোথায় যাচ্ছেন আপনারা? কথা বলতে বলতে গেটের সামনে পাহারারত দারোয়ানটা এগিয়ে এল গাড়িটার দিকে।
লোকটিকে কাছে আসতে দেখে সহজ গলায় ওয়ার্দিংটন বললো, মিঃ আলফ্রেড হিচককের সঙ্গে আমরা দেখা করতে যাচ্ছি।
আপনাদের গেটপাস আছে?
গেটপাস! গেটপাস কি হবে, আমাদের দেখা করার জন্য গেটপাসের কোন দরকার নেই। তাছাড়া আমার মনিবের সঙ্গে তার টেলিফোনে কথা হয়েছে।
ড্রাইভারের কথা শুনে দারোয়ান লোকটি যেন এবার একটু থমকাল। গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বার করার চেষ্টা করল জুপিটার। তারপর ভাবী গলায় বললো, কি ব্যাপার হে, শুধু শুধু দেরি করাচ্ছো কেন?
দারোয়ানটা বললো-ভিতরে যাওয়ার জন্য আপনাদের পাস আছে কিনা জানতে চাইছি।
বললাম তো আমাদের টেলিফোনে বলা আছে।
বাজে কথা। সে রকম কোন এ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে আমি জানতাম।
কি করে?
আমায় অবশ্যই মিঃ হিচকক বলে রাখতেন তাহলে।
জুপিটার বুঝল লোকটা নাছোড়বান্দা মানে-সহজে লোকটা ছাড়বে না। তাই এবার সে ভারি অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাটকীয় এক মুহূর্তের অবতারণা করলো। পিট অবাক হলেও, মুখ খুললো না। জুপিটারকে সে চেনে। জানে, জুপিটার প্রয়োজনে ভালো অভিনয় করতে পারে। বিশেষ করে মুখের চেহারা আর বাচনভঙ্গি বদলাতে সে খুব ওস্তাদ। জুপিটার এবার উঠে গেল টেলিফোনের কাছে। রিসিভারটা হাতে তুলতে তুলতে বললো, ঠিক আছে, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। আমি টেলিফোনে কাকাকে বলছি। তুমি অযথা আমাদের সময় নষ্ট করে দিচ্ছো!
গাড়িতে বসেই সোনার টেলিফোনে জুপিটারকে ফোন করতে দেখে দারোয়ানটির কাছে ব্যাপারটা খুব বিস্ময়কর বলে মনে হলো। লোকটি যে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছে বুঝতে অসুবিধে হল না জুপিটারের।
সত্যিই জুপিটারের এই নাটকীয় ভঙ্গিমায় কাজ যে হলো না তা নয়। টেলিফোনে সে কোন কথাও বলার আগেই দারোয়ান লোকটি কি যেন ভেবে এবার পথ ছেড়ে দিয়ে বললো থাক স্যার, দয়া করে আর ফোন করতে হবে না। আপনারা সোজা ভিতরে চলে যান।
গাড়ি ছুটল আবার। সামনে পাথর কুচির রাস্তা। চারদিক সাজানো গোছানো-চকচক করছে। দু-ধারে সবুজ কার্পেট বিছানো লন। মাঝে মাঝে সুন্দর কাঠের তৈরি ছোট ছোট খুপরি ঘর চোখে পড়লো।
পাথরকুচির রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিলো তখন। স্টুডিও অঞ্চলটি ভালো করে লক্ষ্য করছিল জুপিটার। হিচককের নিজস্ব বাংলোটি খুঁজছিল। প্রতিটি প্রযোজকের নিজস্ব বাংলো থাকে স্টুডিও চত্বরে, আর সেটাই তাদের অফিস ঘর।
….একসময় তারা এসে পৌঁছোল সুন্দর একটা বাংলোর সামনে। গাড়ি থেকে মুখ বাড়ালো জুপিটার। না, ভুল হয়নি চিনতে। বাংলোর দরজার সামনে একটা রুপোলী প্লেট বসানো। তাতে ঝকমক করছে মিঃ আলফ্রেড হিচককের নাম।
গাড়ি থামা মাত্র জুপিটার নেমে পড়লো। ওর পিছন পিছনে পিট। গাড়ি থেকে নেমে জুপিটার বললো ওয়ার্দিংটনের দিকে তাকিয়ে, আমাদের জন্য এখানেই তুমি গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা কর ওয়ার্দিংটন। হয়তো কিছুক্ষণ তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে।
আচ্ছা স্যার।
এবার জুপিটার পিটকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেল বাংলোর দিকে। কাঠের সিঁড়ি টপকে এসে দাঁড়ালো দুজনে একটা কাঁচের ঘরের সামনে। ভিতরে বসে থাকা হিচককের সেক্রেটারি হেনরিটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকা মাত্র হেনরিটা তাকালো তাদের দিকে। মনে হয় সে টেলিফোন করছিল কাউকে। ওদের দেখে রিসিভার নামিয়ে রেখে সবিস্ময়ে বললো হেনরিটা, ও তোমরা, তোমরাই তাহলে মিঃ হিচককের ভাইপো বলে মিথ্যে পরিচয় দিয়েছো ঠিক আছে, দাঁড়াও এবার মজা দেখাচ্ছি আমি তোমাদের, স্টুডিওর পুলিশ কাছেই আছে, আমি ডাকছি তাদের।
কথাটা বলে মেয়েটি দ্রুত হাতে রিসিভার তোলার চেষ্টা করলো।
শোনো হেনরিটা, দাঁড়াও।
জুপিটারের কথায় হেনরিটা তাকালো তার দিকে। তারপর ভ্রূ কুঁচকে বললো, দাঁড়াবো কেন, কিসের জন্য চুপ করে থাকবো? দারোয়ানকে তোমরা মিথ্যে পরিচয় দিয়েছো। দাঁড়াও এবার পুলিশ ডেকে তোমাদের কি করি।
পিট এবার মুখ খুললো। হাতে ঘুসি পাকিয়ে বললো-
এত চিৎকার করছো কেন, আমরা কি কাউকে মারধোর করছি?
তোমাদের কোনও কথা আমি শুনতে চাই না। আজ তোমাদের বুঝিয়ে দেব, এটা তোমাদের আড্ডাখানা নয়, আমাকে এখানেও তোমরা জ্বালাতে এসেছো দেখছি।
ঠিক তা নয় হেনরিটা।
তাহলে?
উত্তেজিতা না হয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে আমার কথা শোনো। কথাটা বলে জুপিটার তাকালো হেনরিটার দিকে। তারপর তার হাত থেকে টেলিফোন রিসিভারটা তুলে নিয়ে নামিয়ে রাখলো টেবিলের একধারে। এবার কোন প্রতিবাদ করলো না হেনরিটা। জুপিটার ঠাণ্ডা গলায় বললো তুমি তো জানোই আমি ভালো অভিনয় করতে পারি। আমি এখানে এসেছি মিঃ হিচকককে আমার অভিনয় প্রতিভা দেখাতে। শুনলাম তিনি নাকি তার আগামী ছবির জন্য একটা ছেলে খুঁজছেন, তাই আমাদের আসা। আমার মনে হয় মিঃ হিচকককে আমি সন্তুষ্ট করতে পারবো।
জুপিটারের এই কথা শোনার পর হেনরিটা তাকালো তার দিকে। মুখচোখে তখনও তার উত্তেজনা মাখানো। বললো তাহলে তুমি-তুমি…
জানি কি বলবে, তোমার দারোয়ান ঠিক বুঝতে পারেনি আমার কথা। আমি কাকা বলতে মিঃ হিচকককে বোঝাইনি, জোন্সকে বুঝিয়েছি। তাহলে বুঝতে পারছো দোষটা আমার নয়। আমি এখানে সত্যি সত্যি কেন এসেছি তাও বললাম। এই ধরো আমাদের পরিচয় লেখা কার্ড, এবার তুমি-
জুপিটার কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই শুনতে পেল একটা ভারি কন্ঠের আওয়াজ।
কি ব্যাপার মিস লারসন?
তিনজনেই এবার তাকালো কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে। জুপিটারের হাতে তার সেই কার্ড। চিনতে অসুবিধে হল না তাদের এই মানুষটাকে। ভারি জুতোর শব্দ তুলে ভদ্রলোক এগিয়ে আসতে আসতে বললেন-
কিছু ব্যাপার ঘটেছে কি। টেলিফোনে তোমার কোন সাড়া পেলাম না বলে, আমাকে আসতে হলো। কি ব্যাপার, হয়েছেটা কি? মিঃ হিচককের কথায় হেনরিটা মুখ খুলল। নরম চাউনি দুচোখে বুলিয়ে নিয়ে আমতা আমতা গলায় বললো, এই ছেলেরা আপনাকে কিছু দেখাতে চায়। মানে আমার মনে হয়, ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং।
না, না এখন কারো কিছু দেখার মতো সময় আমার হাতে নেই। আমি খুব ব্যস্ত। ওদের তুমি চলে যেতে বলো।
কিন্তু স্যার আমি বলি কি, ব্যাপারটা একবার দেখলে পারতেন, মনে হয় আপনার কাজেই লাগবে। মানে-
কথাটা শেষ করলো না হেনরিটা। জড়িয়ে গেল তার কণ্ঠস্বর। তাকালো সে মিঃ হিচককের দিকে।
হেনরিটা যে এতটা তাদের হয়ে বলবে এ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না জুপিটার। পিট লক্ষ্য করছিল হেনরিটা কথা বলতে বলতে বার বার তাকাচ্ছিল জুপিটারের দিকে।
ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগলো না তার। কি এমন তার দেখার আছে জুপিটারের মধ্যে।
হেনরিটার কথায় মিঃ হিচকক যেন কিছু একটা ভাবলেন। তারপর নিজের মনে কিছু একটা ভেবে নিয়ে জুপিটার ও পিটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে। এসো তোমরা আমার সঙ্গে।
মিঃ হিচকক এগিয়ে গেলেন পিছনের একটা দরজার দিকে। জুপিটার ও পিট তাঁকে অনুসরণ করল। পিট লক্ষ্য করছিল হেনরিটাকে। দরজা পার হয়ে মিঃ আলফ্রেড মিঃ হিচকক ওদের ভিতরের লনে নিয়ে গিয়ে বসালেন। তিনজনে বেতের চেয়ারে বসলো।
মিঃ হিচকক বললেন, বল হে ছেলেরা, কি তোমাদের বক্তব্য। আমি তোমাদের সঙ্গে মাত্র পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্য সময় দিতে পারি।
তাহলেই হবে স্যার। এই পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা আপনাকে যা বলতে চাই এবং দেখাতে চাই দেখাতে পারবো।
কথাটা বলে জুপিটার একটা বিজনেস কার্ড এগিয়ে দিল তার দিকে। পিট এবার বুঝতে পারলো জুপিটার মনে মনে তার পরিকল্পনা সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে।
খুব মন দিয়ে মিঃ হিচকক কার্ডটা দেখলেন। তারপর সকৌতুকে বললেন, সবই তো বুঝলাম, তোমরা একেকজন ইনভেসটিগেটার। তা তোমাদের ওই প্রশ্ন চিহ্নটা তো ঠিক বুঝলাম না? ওটা কি নিজেদের ক্ষমতা সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে ব্যবহার করেছো?
না স্যার। ওটা আমাদের বিশেষ ট্রেডমার্ক-সাংকেতিক চিহ্ন।
তা প্রশ্ন চিহ্ন কেন?
এই কারণেই যে আমরা সবরকম কাজেই অভ্যস্ত। তাছাড়া কোন প্রশ্নচিহ্ন-র অর্থই হল উত্তর খুঁজে পাওয়া। আমরা সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর বাতলে দেব।
আর কিছু?
হ্যাঁ! এই ধরনের চিহ্ন জনসাধারণকে আমাদের বিষয়ে জানতে আগ্রহী করবে।
তুমি তো খুব বিজনেস মাইনডেড দেখছি।
তা আমার কাছে কি ব্যাপার?
শুনলাম আপনি নাকি একটা ভুতুড়ে বাড়ি খুঁজছেন। আপনার পরবর্তী ছবির জন্য। আমরা তিনজন ইনভেস্টিগেটর এই কাজের দায়িত্ব নিতে চাই।
জুপিটারের কথায় মিঃ হিচকক চমকালেন যেন। বললেন তা অসম্ভব। আর এই ব্যাপারে আমার নিজস্ব লোকজন আছে তারা খোঁজ করছে। তাছাড়া লোকেশন আমার ঠিক হয়ে গেছে। আগামীকাল বোস্টন শহরে এই ব্যাপারে একজনের সঙ্গে দেখা করার কথা। সে একটা লোকেসন দেখাবে।
আমরা যদি আপনাকে এখানে মানে এই ক্যালিফোর্নিয়াতেই জায়গা দেখে দিই। আমার মনে হয়, এখানে ছবির কাজ করলে খরচও আপনার কম হবে অনেক।
না, তা হয় না। আমি দুঃখিত।
এর জন্য আমাদের টাকা দিতে হবে না স্যার।
সে কি?
হ্যাঁ। প্রথম প্রথম এইসব কাজ করতে গেলে ভালো লোকের সার্টিফিকেটই যথেষ্ট।
আগে আমাদের তো কিছু নামী লোকের কাজ করে দিয়ে গুডউইল করতে হবে, তবে তো ব্যবসা। অন্তত পৃথিবী বিখ্যাত গোয়েন্দারা তাই বলেছেন। যেমন ধরুন শার্লক হোমস, এ্যলারী কুইন-এর কথা। তাই বলছিলাম আপনাকে সাহায্য করলে আমরা তিনজন গোয়েন্দাই উপকৃত হব।
জুপিটারের কথাগুলো মিঃ হিচকক যে মন দিয়ে শুনছিলেন না বোঝা গেল। তিনি ব্যস্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একসময় বললেন-আর কিন্তু সময় নেই।
তাহলে?
তোমরা এখন যেতে পারো আমি মিস লারসেনকে বলছি তোমাদের দরজাটা দেখিয়ে
দিতে।
কথাটা বলে মিঃ হিচকক দাঁড়িয়ে ওঠামাত্র ওরা দু’জনেও উঠে পড়লো। তারপর জুপিটার হিচককের দিকে তাকিয়ে বললো, ধন্যবাদ স্যার। তার দরকার হবে না, আমরা নিজেরাই চলে যেতে পারবো।
তারা আর দাঁড়ালো না। এগিয়ে গেল দরজার কাছে। দরজার কাছে পৌঁছোনো মাত্র তারা শুনতে পেল হিচককের কণ্ঠস্বর, শোনো।
থমকে দাঁড়ালো পিছু ডাক শুনে। তাকালো দু’জনে প্রায় একসঙ্গে। এগিয়ে এলো আবার তারা দাঁড়িয়ে থাকা হিচককের দিকে।
কি ব্যাপার স্যার?
কাছে আসতেই জুপিটারকে লক্ষ্য করে মিঃ হিচকক বললেন-আমার মনে হয় তোমাদের এখনও সব কথা বলা হয়নি। কিছু একটা অবশ্যই বাকি আছে। একটু থেমে বললেন, মিস লারসন যে জিনিসটা দেখার কথা আমাকে বলেছে, তা কিন্তু তোমরা এখনো আমাকে দেখাওনি-নিশ্চয়ই ওটা ওই একটা সামান্য কার্ড নয়, যা তাকে মুগ্ধ করেছে।
ঠিক তাই স্যার!
তাহলে?
এবার জুপিটার তার প্রখর বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে চটপট বললো, আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার মিস লারসন আপনাকে ঠিকই বলেছেন। আমি আমার মুখের চেহারাটা যে কোন সময় বড়োমানুষের মতো বদলাতে পারি, সেই সঙ্গে আমার গলার স্বরটাও। সে আমার এই বদলানো মুখের চেহারা দেখেই অবাক হয়ে আপনাকে বলেছে।
তাই নাকি। মিঃ হিচকক তাকালেন। দুচোখে তার গভীর কৌতূহল। সকৌতুকে বললেন-কি রকম নিজেকে বয়স্ক করতে পারো দেখি তো একবার?
দেখবেন স্যার?
অবশ্যই দেখবো।
বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক মিঃ হিচকক এবার তার প্রখর দৃষ্টিকে সজাগ রাখলেন জুপিটারের দিকে তাকিয়ে। লক্ষ্য করলেন জুপিটারের মুখের চেহারাটা ভারি অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। ঠিক একটা বয়স্ক লোক বলে মনে হচ্ছে তাকে।
কি দেখছেন মিঃ হিচকক। এবার কি আপনি আমার ভিন্ন রকমের কণ্ঠস্বর শুনতে চান? যদি চান তো শুনুন তাহলে।
কথাটা শেষ করে জুপিটার তার মুখের চেহারা বদলে কণ্ঠস্বরকে বেশ অন্যরকম করে তুললো। তারপর বললো, মিঃ হিচকক কিছুদিন হল আপনি ছোট ছেলেদের নিয়ে একটা ছবি করার কথা ভাবছেন তাই না। শুনুন আমি সব কিছু দেখতে পাই-তাই বলছি যদি আপনি সেই চেষ্টা করেন তো-
অবাক হয়ে মিঃ হিচকক লক্ষ্য করছিলেন জুপিটারকে। তার সুন্দর মুখের চেহারা বিশ্রিভাবে বদল হল। তার কাছেও যে ব্যাপারটা বেশ অবাক লেগেছে বুঝতে অসুবিধে হলো না। বললেন তিনি বিরক্ত মাখা স্বরে-আরে বাবা, ঠিক একটা দৈত্যের মত দেখতে লাগছে! ওহে ছোকরা বন্ধ কর এবার। আর তোমাকে ওই ভয়ংকর মুখটা দেখাতে হবে না।
মিঃ হিচককের কথা শোনামাত্র মুহূর্তে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল জুপিটার। বললো, কি রকম দেখলেন স্যার?
আশ্চর্য!
খুব মজার ব্যাপার তাই না স্যার। আমার কাছেও ব্যাপারটা খুব মজার বলে মনে হয়। আমার বন্ধুরা প্রায়ই আমাকে এই ভঙ্গিতে দেখতে চায়। এইরকমভাবে মুখভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে বলে।
কাজটা মোটেই ভালো নয়। তবে এটা ঠিক ব্যাপারটা খুব নিখুঁতও হয়নি।
বার কয়েক করলে নিখুঁত হয়ে যাবে।
থাক্ থাক খুব হয়েছে। একটু থেমে মিঃ হিচকক জুপিটারের দিকে তাকিয়ে বললেন, শোনো যদি আমাকে কথা দাও-এমন আর কখনও করবে না, তাহলে আমি তোমাকে বিশ্বাস করে একটা কাজের দায়িত্ব দিতে পারি।
ধন্যবাদ মিঃ হিচকক, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। একটু থেমে জুপিটার বললো-তাহলে ভূতুড়ে বাড়ি খোঁজার দায়িত্ব তোমাদের আমি দিতে পারি। কি রাজি?
জুপিটার হাসলো। বললো, কথা দিলাম স্যার।
তাহলে আমিও তোমাদের কথা দিলাম।
করমর্দনের জন্য হাতটা জুপিটারের দিকে বাড়িয়ে দিলেন মিঃ হিচকক।
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
