Role of Rural Sixteenths in Rural Life
Role of Rural Sixteenths in Rural Life
আইনি ঝামেলা এড়িয়ে গ্রামবাংলার মানুষের সামাজিক বিচার, মেলবন্ধন আর নিজস্ব সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার বহু প্রাচীন অলিখিত নিয়ম হলো ‘গ্রাম্য ষোলোআনা’। গোপাল মণ্ডলের এই লেখায় দক্ষিণবঙ্গ এবং বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার পল্লীজীবনের পটভূমিতে ষোলোআনার গুরুত্ব, সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব এবং আধুনিকতার চাপে এটি কীভাবে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে, তারই এক অমূল্য চিত্র ফুটে উঠেছে। মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী দিকটি তুলে ধরা এবং পাঠকের জ্ঞান ও ভাষাবোধকে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই ‘Role of Rural Sixteenths in Rural Life’ শীর্ষক প্রবন্ধটির অবতারণা।
গ্রামীণ জীবনে গ্রাম্য ষোলোআনার ভূমিকা
গোপাল মণ্ডল

⟽ পূর্ববর্তী প্রবন্ধ : মহাকাশ দুর্ঘটনা
➲ গ্রামীণ সমাজের এক অতি প্রাচীন অথচ অলিখিত প্রতিষ্ঠান হল গ্রাম্য ষোলোআনা [Village Council: 16 Anna System]। বর্তমান শতকের পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থার আড়ালে ইহা অনেকটা ম্লান হইলেও, গ্রামীণ জীবনের শৃঙ্খলা, বিচার ও সংহতির এক অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসাবে ইহার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বলা যায়, ইহা গ্রামীণ জনজীবনের এক গোপন সংবিধান। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ইহা Informal Local Governance System এর সহাবস্থান করে, যেখানে আইন, ধর্ম, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি একই সূত্রে গ্রথিত।
‘ষোলোআনা’ শব্দবন্ধটির উৎপত্তি ব্রিটিশ-পূর্ব জমিদারি প্রথা হইতে। প্রাক-ব্রিটিশ আমলে এক টাকা = 16 আনা। গ্রামের সমস্ত জমি কাল্পনিকভাবে 16 আনা হিসাবে ধরা হইত এবং প্রতি আনার প্রতিনিধি লইয়াই গ্রামের সার্বিক সভা গঠিত হইত। তাই ইহা ‘ষোলোআনা’ নামে পরিচিত। ইহার গঠন সর্বত্র সমান নয়। সাধারণত গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ, মাতব্বর, মোড়ল, পুরোহিত, শিক্ষক এবং ভূস্বামী শ্রেণীর সমন্বয়ে ইহা গঠিত। এর সদস্য সংখ্যা 5 হইতে 21 পর্যন্ত হইতে পারে, যদিও নাম ষোলোআনাই থাকিয়া যায়। এর কোন লিখিত গঠনতন্ত্র নাই, এর ভিত্তি হলো – ‘Village Morality and Consensus’।
➲পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম্য ষোলোআনার উপস্থিতি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে আসে উনবিংশ শতকের জমিদারি সেটেলমেন্ট রিপোর্টে। 1872 সালের Hunter এর Statistical Account of Bengal এ বীরভূম ও বাঁকুড়ার গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থা হিসাবে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়, এবং তা স্বীকৃতি পায় 1911 সালের লোকগণনায়। বর্তমানে Institute of Rural Studies, Santiniketan এর তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের 23 টি জেলার মধ্যে 17 টি জেলার প্রায় 341 টি ব্লকের 2700 টি গ্রামে ষোলোআনা ব্যবস্থা কমবেশি সক্রিয়, যার হার প্রতি ব্লকে গড়ে 12-15 টি গ্রাম। যেখানে সরকারি বিচার ব্যবস্থায় একটি দেওয়ানি মামলার গড় নিষ্পত্তি সময় 3.5 বছর [National Judicial Data Grid, 2022], সেখানে ষোলোআনায় ইহা 7-15 দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় এবং খরচ প্রায় শূন্য। যেখানে থানা-আদালতে একটি মামলার খরচ গড়ে 5000-10000 টাকা, সেখানে ষোলোআনায় ইহা 100-500 টাকা চা-পানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। School of Social Work, Visva-Bharati, 2019 সালে পশ্চিমবঙ্গের 6 টি জেলা থেকে 1200 টি গ্রামের তথ্য সংগ্রহ করিয়া দেখেন যে, এই 6 টি জেলার 890 টি গ্রামের মোট 12 লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 7.5 লক্ষ জনসংখ্যা সরাসরি ষোলোআনা নির্ভর বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থাশীল এবং প্রায় 60% পারিবারিক বিবাদ থানায় না গিয়া ষোলোআনাতেই মীমাংসা হয়। 2021 সালে মুর্শিদাবাদের ডোমকল ব্লকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে এখানকার 26% গ্রামে এখনও ষোলোআনার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। Centre for Studies in Social Sciences, Calcutta [CSSSC] এর রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের 34% গ্রাম্য বিরোধ এখনও পঞ্চায়েতের বাইরে ষোলোআনায় মেটানো হয়।
➲নদীমাতৃক গ্রামবাংলায় নদী যেমন জীবনধারণের এক অন্যতম প্রাকৃতিক আশীর্বাদ, তেমনি গ্রামীণ জীবনও এই ষোলোআনার ছত্রছায়া ছাড়া অসম্পূর্ণ। দক্ষিণবঙ্গের গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল তথা বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, হুগলী, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ অঞ্চল হলো ষোলোআনার অন্যতম ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় জানা গেছে, গঙ্গা-ভাগীরথী-অজয়-দামোদর অববাহিকার অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গের প্রায় 68,000 বর্গকিলোমিটার এলাকার 4.5 কোটি গ্রামীণ জনসংখ্যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ষোলোআনার কবলে তথা প্রভাবে আবদ্ধ। বীরভূমের লাভপুর ও বর্ধমানের আউশগ্রাম সংলগ্ন 13 টি গ্রামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গ্রাম্য সম্পত্তির 0.05% ভাগ ষোলোআনার নামে উৎসর্গীকৃত থাকে, যাহা হইতে পূজা, কীর্তন ইত্যাদি পরিচালিত হয়। দক্ষিণবঙ্গের এই ক্ষেত্রে পাললিক শিলার মতোই স্তরে স্তরে ষোলোআনা গড়িয়া উঠিয়াছে। সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এই সামাজিক প্রবাহ অব্যাহত থাকায় নিম্নবর্গ হইতে উচ্চবর্গ পর্যন্ত সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ইহাতে সুনিশ্চিত। গ্রামীণ সমাজ পাললিক শিলার ন্যায় বিভিন্ন জাতি ও পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায়, নিম্নভূমি অঞ্চলে যেমন জলসঞ্চয় হয়, তেমনি ষোলোআনাও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মতামত সঞ্চয় করিয়া এক বৃহৎ সামাজিক ভাণ্ডার গড়িয়া তুলিয়াছে। গ্রাম্য ষোলোআনা মূলতঃ দুই প্রকারের লক্ষণীয়, যথা – বংশানুক্রমিক ষোলোআনা, যাহা মূলতঃ পুরাতন গ্রামে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপলব্ধ এবং নির্বাচিত ষোলোআনা, যাহা নূতন গঠিত গ্রাম বা কলোনী অঞ্চলে উপলব্ধ। Role of Rural Sixteenths in Rural Life
গ্রামীণ জীবনে ষোলোআনার প্রভাব মারাত্মক তথা সুদূরপ্রসারী। প্রাচীনকালে ইহা দিয়াই অনেক গুপ্ত রাজবিদ্রোহ দমন করা হইত। সপ্তদশ হইতে বিংশ শতকে ষোলোআনা আবার গ্রামের উন্নয়নেও ব্যবহার হইত। গ্রামে 120 হইতে 180 ঘর বসতি থাকিলে 24 ঘণ্টার মধ্যে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবধারিত। British Anthropologist Nicholas B. Dirks এর Study অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বছরে 18 টি গ্রামের মধ্যে 1 টি গ্রামের শান্তি বজায় থাকে ষোলোআনার প্রভাবে। 2014 সালের World Bank এর Rural Governance Study অনুসারে প্রতি 5 টি গ্রামের মধ্যে 1 টি গ্রামে সরকারি প্রকল্পের সফল রূপায়ণ ঘটে ষোলোআনার সহযোগিতায়। এরূপ ক্ষমতার জন্য ষোলোআনাকে ‘King of Village’ নামে অভিহিত করা হয়। ষোলোআনার সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে স্বল্প সময়ের মধ্যেই যেকোন সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায় এবং ক্রনিক সিদ্ধান্তে [দীর্ঘদিন ধরিয়া চলা সামাজিক রীতির ফলে এরূপ সিদ্ধান্ত ঘটে] গ্রাম্য জীবনে কাঠামোগত ও কার্যগত অস্বাভাবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। ষোলোআনার প্রভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি প্রভাবিত হয় এবং লক্ষণ হিসাবে জমির আইল নিয়ে বিবাদ, তলপেটে যন্ত্রণার মতো পারিবারিক কলহ ইত্যাদি দৈনন্দিন সমস্যা দূরীভূত হয়। ষোলোআনার প্রভাবে গ্রামের উৎসব ও ধর্মও প্রভাবিত হয়। উৎসবের দিনগুলিতে গ্রামীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার দ্বায়িত্ব বর্তায় ষোলোআনার উপর। ষোলোআনার প্রভাবে গ্রামের সংস্কৃতি উচ্ছৃংখল যুবসমাজের চুলকানি থেকে কিছুটা হলেও বিপণ্মূক্ত থাকে । অন্যতম প্রধান গ্রামীণ সমাজ বিশেষজ্ঞ তথা Institute of Rural Reconstruction এর Professor Manoranjan Mondal এর ভাষায় “No aspect of rural life goes untouched by Sholoana,” এ থেকেই ষোলোআনার ব্যাপকতা অতি সহজেই উপলব্ধ।
পশ্চিমবঙ্গে সর্বপ্রথম ষোলোআনার উপস্থিতির কথা জনসমক্ষে আসার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে School of Environmental Studies এর মতোই School of Social Sciences এক Vigorous Research আহ্বান করে এবং 1995 সালে প্রথম আন্তর্জাতিক গ্রামীণ সমাজ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এরপর 1998 সালের ফেব্রুয়ারিতে বোলপুরে ‘Role of Informal Council in West Bengal : Cause effect and remedies’ শিরোনামে এবং 1999 সালে 12ই এপ্রিল ‘Aquifer of Rural Power Structure in Bengal and Bangladesh’ শিরোনামে পরপর দুটি সেমিনার আয়োজিত হয়। ঐ বছরেই জুন মাসে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে জীব ও ভূবিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে National workshop on Rural Governance: Its cause, effects and mitigation নামক কার্যাবলীতে বিভিন্ন গবেষণাপত্রের আলোকে ষোলোআনার প্রভাব এবং তাহা সংস্কারের প্রযুক্তির পন্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। UNICEF এবং World Bank গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য ষোলোআনাকে পঞ্চায়েতের সাথে যুক্ত করার উপদেশ প্রদান করে।
➲বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার গোয়ালা সমাজে ইহার প্রভাব আরও প্রকট। এই সমাজে গোয়ালা বলিতে মূলতঃ ঘোষ, গোপ, সদগোপ, আহির, যাদব প্রভৃতি সম্প্রদায়কে বোঝায়। 2011 Census অনুযায়ী বাঁকুড়ায় গোয়ালা জনসংখ্যা 3,12,450 জন [প্রায় 8.7%] এবং পুরুলিয়ায় 2,85,320 জন [প্রায় 9.8%]। Institute of Rural Studies, Santiniketan এর তথ্য অনুযায়ী বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার 37 টি ব্লকের মধ্যে 31 টি ব্লকের গোয়ালা অধ্যুষিত 540 টি গ্রামে ষোলোআনা সক্রিয়, যার হার প্রতি ব্লকে গড়ে 17-19 টি গ্রাম। তথ্য অনুযায়ী গ্রাম্য বিচারের সর্বোচ্চ অনুমোদিত সময় 30 দিন বা 720 ঘণ্টা, সেখানে গোয়ালা সমাজের ষোলোআনায় ইহা 0.5 দিন বা 12 ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়। এই দুই জেলার গোয়ালা সমাজে ষোলোআনা মূলতঃ পাঁচটি ক্ষেত্রে কাজ করে, যথাঃ Role of Rural Sixteenths in Rural Life
I. গোষ্ঠীগত বিবাহ ও গোত্র নিয়ন্ত্রণ: বাঁকুড়ার ওন্দা, বিষ্ণুপুর এবং পুরুলিয়ার হুড়া, পুঞ্চা ব্লকের গোয়ালা সমাজে এখনও ‘ঘোষ ষোলোআনা’ নামে পৃথক ষোলোআনা আছে। একই গোত্রে [যেমন – কাশ্যপ, শাণ্ডিল্য] বিবাহ হইলে, বিবাহ বিচ্ছেদ হইলে, বা যৌতুক লইয়া অশান্তি হইলে ইহারা ‘সমাজ ডাক‘ করে। 2020 সালে বাঁকুড়ার ইন্দাস ব্লকে 42 টি আন্তঃগোত্র বিবাহের মধ্যে 38 টিই ষোলোআনার অনুমতিতে মীমাংসা হয়। মেয়ে পালাইয়া গেলে বা বিধবা বিবাহের ক্ষেত্রে ‘গোবর ছেটানো’ বা ‘জাত তোলা’র মতো শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়াও ইহারাই নির্ধারণ করে।
II. পশুসম্পদ ও চারণভূমি ব্যবস্থাপনা: গোয়ালা সমাজের প্রধান জীবিকা গবাদি পশু পালন। বর্ষাকালে কার গরু কোন মাঠে চরিবে, শ্মশান বা খাস জমিতে চারণের অধিকার, দুধের দাম নির্ধারণ [বর্তমানে প্রতি লিটার 38-42 টাকা], ‘বাথান’ পরিচালনা – সবই ষোলোআনা ঠিক করে। School of Environmental Studies [SOES], Jadavpur University, 2021 সালে বাঁকুড়ার 9 টি ব্লক হইতে 1050 টি পশুপালকের নমুনা সংগ্রহ করিয়া দেখেন যে, এই 9 টি ব্লকের 270 টি গ্রামের মোট 42,000 গবাদি পশুর মধ্যে 60% পশুর চারণভূমি সংক্রান্ত বিবাদ ষোলোআনাতেই মেটে।
III. ধর্মীয় ও লোকসংস্কৃতি: গোয়ালা সমাজের ‘গাজন’, ‘ভাদু পূজা’, ‘মনসা পূজা’, ‘গো-বন্দনা’ – এই সব উৎসবের চাঁদা, বাজনা, মেলা পরিচালনার দায়িত্ব ষোলোআনার। পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ব্লকে ‘ঘোষ ষোলোআনা’ প্রতি বছর ভাদ্র মাসে 10,000 টাকা পর্যন্ত চাঁদা তুলিয়া ভাদু উৎসব করে।
IV. অর্থনৈতিক জরিমানা ব্যবস্থা: কোন ব্যক্তি সমাজের নিয়ম ভাঙিলে জরিমানা হিসাবে ‘ষোলোআনা খাওয়া’ প্রথা আছে। অর্থাৎ দোষী ব্যক্তিকে সমগ্র গ্রামকে বা ষোলোআনাকে ভোজ খাওয়াইতে হয়। ইহার খরচ গড়ে 15,000-25,000 টাকা। Institute of Public Health Engineering এর মতোই District Rural Development Agency [DRDA] এর তথ্য অনুযায়ী বাঁকুড়ার 5 টি ব্লকের অবস্থা আশঙ্কাজনক, যেখানে প্রতি বছর গড়ে 25-30 টি ‘ভোজ জরিমানা’ হয়।
➣দেখুন: Competitive current Affairs 2026
➲নদীমাতৃক উপমহাদেশের রুক্ষ লালমাটির এই অঞ্চলে ষোলোআনা এক বিশাল জলাধারের মতো কাজ করে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবঙ্গের কংসাবতী-দ্বারকেশ্বর-শিলাবতী উপত্যকা অঞ্চল হল ষোলোআনার অন্যতম ক্ষেত্র। এখানে হিমালয় হইতে উৎপন্ন শিলার মতোই ছোটনাগপুর মালভূমি হইতে আগত ‘ডিহি’ প্রথা নদী দ্বারা পরিবাহিত হইয়া নিম্ন অববাহিকায় সঞ্চিত হয়। সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এই সামাজিক প্রবাহ অব্যাহত থাকায় নিম্নভূমি অঞ্চলে গোয়ালা ষোলোআনার সঞ্চয়ও অব্যাহত।
আর্সেনিক যেমন ভৌমজলস্তরে ক্রমশঃ নীচের দিকে অধোগত হয়, তেমনি ষোলোআনাও বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু। 2008 সালেই বাঁকুড়ার সোনামুখী ব্লকে প্রথম ষোলোআনা ভাঙনের খবর জনসমক্ষে আসে। ইহার কারণগুলি মূলতঃ তিন প্রকার
A. অর্থনৈতিক কারণ [Economic Remediation Failure]:
I. পেশা পরিবর্তন: পূর্বে 90% গোয়ালা গবাদি পশু নির্ভর ছিল, এখন 2023 সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় মাত্র 28% গোয়ালা পশুপালনে আছে, বাকি 72% পরিযায়ী শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, টোটো চালক। ফলে চারণভূমি কেন্দ্রিক ষোলোআনার প্রয়োজনীয়তা কমিয়াছে। একটি গরু দিনে তার খাবারের 10% [0.2 Kg] পর্যন্ত খড় খায়, যাহা এখন বাজার হইতে 12 টাকা কেজি দরে কিনিতে হয়। তাই গরু রাখা লোকসান।
II. বাজার অর্থনীতি: দুধ এখন আর গ্রামে বিক্রি হয় না, সরাসরি ‘আমুল’, ‘মেট্রো ডেয়ারি’র কাছে চলিয়া যায়। দাম কোম্পানি ঠিক করে, ষোলোআনা নয়।
➣দেখুন: WB Gram Panchayat Mock set
B. সামাজিক কারণ [Social Remediation]:
I. শিক্ষা ও সচেতনতা: 2001 সালে বাঁকুড়ায় গোয়ালা সমাজে সাক্ষরতার হার ছিল 54%, 2011 সালে তাহা 71.3%। শিক্ষিত যুবকরা আর মাতব্বরের বিধান মানিতে চায় না, তারা থানা বা কোর্টে যায়।
II. যৌথ পরিবার ভাঙন: পূর্বে গড় পরিবারে 7-9 জন সদস্য ছিল, এখন তাহা 3.8 জনে নামিয়াছে। ফলে ষোলোআনার জনবল কমিয়াছে।
III. সংরক্ষণ ও পঞ্চায়েতী রাজ: 1978 সালে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আসার পর সরকারি অনুদান, আবাস যোজনা, 100 দিনের কাজ – সব পঞ্চায়েতের হাতে। ফলে ষোলোআনার অর্থনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পাইয়াছে। মানুষ এখন ভোটের জন্য প্রধানের কাছে যায়, ষোলোআনার কাছে নয়।
C. সাংস্কৃতিক কারণ [Cultural Remediation]:
I. লোকসংস্কৃতির অবক্ষয়: ভাদু, টুসু গানের পরিবর্তে মোবাইলে রিল দেখা। ফলে ষোলোআনা পরিচালিত উৎসবের প্রতি আকর্ষণ কম।
II. জাতপাতের শিথিলতা: পূর্বে ‘ঘোষ’ ‘গোপ’ আলাদা ষোলোআনা ছিল, এখন আন্তঃজাতি বিবাহের হার 2011 সালে 3% হইতে 2023 সালে 14% হইয়াছে। ফলে জাতভিত্তিক ষোলোআনার ভিত্তি দুর্বল।
III. আলোক-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মতোই আধুনিকতার প্রক্রিয়া: প্রতি 11 বছর অন্তর সৌরকলঙ্ক চক্রের মতোই প্রতি 5 বছর অন্তর ভোটের চক্রে গ্রামের যুবকরা রাজনৈতিক দলে বিভক্ত হইয়া পড়িতেছে। ফলে নিরপেক্ষ ষোলোআনা আর থাকিতেছে না। ইহা তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম ইত্যাদি রাজনৈতিক বিভাগে বিভক্ত। Role of Rural Sixteenths in Rural Life
➣দেখুন: Primary TET Practice set
➲ষোলোআনা কয়েক শতাব্দীর এক পরম আশীর্বাদ। জীবজগতের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জীবনধারণের উপাদান জলের মতোই গ্রামীণ জীবনের সাথে মিশিয়া রহিয়াছে এই ষোলোআনা। তবে বর্তমানে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা, পক্ষপাতিত্ব এই ব্যবস্থাকে ক্রমশ কলঙ্কিত করে চলেছে । মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ, অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব প্রভৃতির কাছে গ্রামীণ ষোলোআনাগুলো ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে । বর্তমান সময়ে দেখা যায় দুর্বল ষোলোআনাগুলোর আহ্বানে গ্রামীণ জনতা আর খুব একটা সাড়া দেয় না । আধুনিক নেটিজেনরা তো ষোলোআনার মতো সুপ্রাচীন একটি কাঠামোকে তোয়াক্কাও করে না । গ্রাম-বাংলার এই কাঠামোর ভবিষৎ তাই ভবিষ্যতের গহ্বরেই প্রোথিত রয়েছে ।
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.