NIRYAS.IN

শিক্ষাদান বাগানের মালির মতো

NIRYAS.IN

শিক্ষাদান বাগানের মালির মতো

মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রস্তুতি

Madhyamik History Model Answers-10/2

Madhyamik History Model Answers-10

মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ? ইতিহাস বিষয়ে 90-এ 90 পাওয়ার স্বপ্ন দেখছ? তাহলে তোমার এই প্রস্তুতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে আমরা নিয়ে এসেছি মাধ্যমিক (ইতিহাস) (Madhyamik History Model Answers-10) (উত্তরসহ)।নতুন ও আপডেটেড সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি এই মডেল প্রশ্নপত্রটিতে রয়েছে বিভাগ – ক: 20 নম্বরের 20টি MCQ (ব্যাখ্যা সহ), বিভাগ – খ: 16 নম্বরের 16টি অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (1 নম্বরের), বিভাগ – গ: 22 নম্বরের 11টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (2 নম্বরের) এবং বিভাগ – ঘ: 24 নম্বরের 6টি বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন (4 নম্বরের) ও বিভাগ – ঙ: 8 নম্বরের 1টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন (8 নম্বরের) সহ প্রতিটি বিভাগের নির্ভুল ও সম্পূর্ণ সমাধান।। প্রতিটি উত্তরের সাথে উৎস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই মূল পাঠ্যবইয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে।


➣ Join : Our Telegram Channel

➣ Join : Our Whats App Group


Madhyamik History Model Answers-10

Madhyamik History Model Answers
Madhyamik History Model Answers

ইতিহাস(History)

(Part- 2)

⟽ Previous Part

বিভাগ – ঘ: বিশ্লেষণধর্মী

4.1 বাংলায় নবজাগরণে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: রাজা রামমোহন রায় (1772-1833) কে ‘ভারত পথিক’, ‘ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ’ ও ‘বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত’ বলা হয়। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী আন্দোলন শুরু করেন।
i. সতীদাহ নিবারণ: তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি সতীদাহ প্রথা নিবারণ। 1818 সালে তাঁর নিজের বৌদিকে সতী হতে দেখে তিনি মর্মাহত হন। তিনি শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে বেদ-উপনিষদে সতীদাহের কোনো বিধান নেই। তিনি ‘সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ’ (1818) গ্রন্থ লেখেন এবং জনমত গঠন করেন। তাঁর চেষ্টায় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক 1829 সালের 4 ডিসেম্বর 17 নং রেগুলেশন দ্বারা সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। রক্ষণশীল হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে প্রিভি কাউন্সিলে মামলা করলে রামমোহন ইংল্যান্ডে গিয়ে তার বিরোধিতা করেন।
ii. ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা: 1828 সালের 20 আগস্ট তিনি ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে 1830 সালে ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিত হয়। এখানে তিনি একেশ্বরবাদ প্রচার করেন, পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন ঈশ্বর এক ও নিরাকার, সকল মানুষ সমান।
iii. শিক্ষা সংস্কার: তিনি ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থক। তিনি বলেন, ভারতের উন্নতির জন্য আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা প্রয়োজন। 1817 সালে হিন্দু কলেজ, 1822 সালে অ্যাংলো হিন্দু স্কুল এবং 1825 সালে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সাহায্য করেন। সংস্কৃত শিক্ষার বদলে ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে তিনি লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লেখেন।
iv. সংবাদপত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা: 1821 সালে তিনি বাংলা সাপ্তাহিক ‘সংবাদ কৌমুদী’ এবং 1822 সালে ফারসি পত্রিকা ‘মিরাত-উল-আখবার’ প্রকাশ করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।
v. নারী মুক্তি ও আন্তর্জাতিকতা: তিনি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন এবং নারী শিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে মত দেন। 1830 সালে তিনি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহের দূত হিসাবে ইংল্যান্ডে যান, সেখানে ‘রাজা’ উপাধি পান এবং 1833 সালে ব্রিস্টলে মৃত্যুবরণ করেন। তিনিই বাংলায় যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়ে দেন।

Madhyamik History Model Answers-10

4.2 বাংলায় ওয়াহাবি ও ফরাজী আন্দোলনের প্রকৃতি আলোচনা করো – এগুলি কি কৃষক আন্দোলন?
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের সংস্কারের নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন গড়ে ওঠে – ওয়াহাবি ও ফরাজী আন্দোলন। এদের বাইরের রূপ ধর্মীয় হলেও ভিতরের প্রকৃতি ছিল কৃষক আন্দোলন।

ক) ওয়াহাবি আন্দোলন: ভারতে এই আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন সৈয়দ আহমেদ বেরেলভি। তিনি আরবের আব্দুল ওয়াহাবের আদর্শে ইসলামের শুদ্ধিকরণ এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন। বাংলায় এর নেতা ছিলেন মীর নিসার আলি, যিনি তিতুমীর নামে পরিচিত। তিনি 24 পরগনার বারাসাতের নারকেলবেড়িয়া গ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করেন। জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে 1831 সালে তিনি বাঁশ দিয়ে একটি কেল্লা (বাঁশের কেল্লা) তৈরি করেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ব্রিটিশ সেনা কামান দিয়ে কেল্লা ধ্বংস করে তিতুমীরকে হত্যা করে।

খ) ফরাজী আন্দোলন: 1818 সালে ফরিদপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে হাজী শরীয়তউল্লাহ (1781-1840) এই আন্দোলন শুরু করেন। ফরজ মানে ইসলামের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য – কলমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত। তিনি পীর পূজা, কবর পূজা, কুসংস্কারের বিরোধিতা করে শুদ্ধ ইসলাম পালনের ডাক দেন। তাঁর পুত্র মুহসীনউদ্দিন আহমেদ, যিনি দুদু মিঞা (1819-1862) নামে পরিচিত, এই ধর্মীয় আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী কৃষক আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি ঘোষণা করেন “জমির মালিক আল্লাহ, জমিদার নয়”। তিনি কৃষকদের খাজনা বন্ধ করতে বলেন, নিজস্ব আদালত ও লাঠিয়াল বাহিনী তৈরি করেন এবং জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশালে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

এগুলি কি কৃষক আন্দোলন?
ঐতিহাসিকদের মতে, ধর্মীয় সংস্কারের মোড়কে শুরু হলেও প্রকৃতিতে এগুলি কৃষক আন্দোলন ছিল, কারণ –
i. এর অংশগ্রহণকারী ছিল মূলত দরিদ্র মুসলিম কৃষক।
ii. এর মূল দাবি ছিল জমি, খাজনা, দাদন, বেগার শ্রম ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা কৃষক সমস্যা।
iii. শত্রু ছিল জমিদার, মহাজন, নীলকর ও ব্রিটিশ – যারা কৃষকদের শোষণ করত।
তবে এর সীমাবদ্ধতা ছিল – নেতৃত্বে ছিলেন ধর্মীয় নেতা, হিন্দু-মুসলিম কৃষক ঐক্য গড়ে ওঠেনি এবং কিছু ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক রূপও নিয়েছিল। তাই বলা যায়, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও প্রকৃতিতে এটি ছিল বাংলার প্রথম কৃষক জাগরণ।

4.3 বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার বিকাশে ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ ও ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ এর ভূমিকা লেখো।
উত্তর: বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি গড়ে দেয় দুটি প্রতিষ্ঠান – IACS ও বসু বিজ্ঞান মন্দির।

ক) ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS – 1876):
প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার। 1876 সালের 29 জুলাই কলকাতায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভূমিকা:
i. এটি ছিল ভারতীয়দের অর্থে, ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য ছাড়াই বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব – এই স্বদেশি আদর্শ ছিল এর মূল ভিত্তি। উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করা।
ii. এখানে জগদীশচন্দ্র বসু, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, প্যারীচরণ সরকার নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন।
iii. এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনা হল 1928 সালে সি. ভি. রমন এখানে বসেই ‘রমন প্রভাব’ (Raman Effect) আবিষ্কার করেন। এর জন্য তিনি 1930 সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান – বিজ্ঞানে ভারতের প্রথম নোবেল।
iv. এটি ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানী এখানে গবেষণা করেন।

খ) বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute – 1917):
প্রতিষ্ঠাতা আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। 1917 সালের 30 নভেম্বর তিনি নিজের বাড়িতে (93/1 আপার সার্কুলার রোড) এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ভূমিকা:
i. এটি ছিল ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। জগদীশচন্দ্র এখানে বেতার তরঙ্গ, উদ্ভিদের প্রাণ নিয়ে গবেষণা করেন।
ii. তিনি ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ যন্ত্র আবিষ্কার করে প্রমাণ করেন উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, উদ্ভিদ উত্তেজনায় সাড়া দেয়।
iii. এই প্রতিষ্ঠানে মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্রমোহন বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন।
iv. এটি স্বদেশি বিজ্ঞান চেতনার প্রতীক ছিল – প্রমাণ করে যে ভারতীয়রাও বিশ্বমানের বিজ্ঞান চর্চা করতে পারে।

দুটি প্রতিষ্ঠানই বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি এবং ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশের অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে।

Madhyamik History Model Answers-10

4.4 ‘আনন্দমঠ’ ও ‘গোরা’ উপন্যাসে জাতীয়তাবাদের ধারণা কীভাবে ফুটে উঠেছে?
উত্তর: বাংলায় জাতীয়তাবাদ বিকাশে দুটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ (1882) ও রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ (1910)। দুটি উপন্যাসে জাতীয়তাবাদের দুটি ভিন্ন রূপ ফুটে উঠেছে।

ক) আনন্দমঠ (1882):
i. পটভূমি: 1770 সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা। বঙ্কিম দেখান কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে বাংলার মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাচ্ছে।
ii. বন্দেমাতরম মন্ত্র: এই উপন্যাসেই বঙ্কিম ‘বন্দেমাতরম’ গানটি রচনা করেন – ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম’। দেশকে মা হিসাবে পূজা করার এই মন্ত্রটি স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ এতে সুর দেন।
iii. সন্তান দল: সত্যানন্দের নেতৃত্বে ‘সন্তান দল’ নামে একদল যুবক দেশের জন্য প্রাণ দেয়। তাদের কঠোর শৃঙ্খলা, গোপন সংগঠন ও আত্মত্যাগের আদর্শ পরবর্তীতে অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী সংগঠনের আদর্শ হয়।
iv. প্রকৃতি: এখানে জাতীয়তাবাদ ধর্মীয়, বিশেষ করে হিন্দু জাতীয়তাবাদ। মুসলিমদের বিরুদ্ধে কিছুটা বিরূপ মনোভাব থাকলেও মূল লক্ষ্য ব্রিটিশ বিরোধিতা।

খ) গোরা (1910):
i. পটভূমি: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের (1905) পটভূমিতে লেখা। নায়ক গোরা প্রথমে একজন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী, যে ব্রাহ্ম সমাজ ও খ্রিস্টান ধর্মের ঘোর বিরোধী।
ii. জাতীয়তাবাদের বিবর্তন: উপন্যাসের শেষে গোরা জানতে পারে সে আসলে আইরিশ দম্পতির সন্তান, এক হিন্দু পরিবার তাকে মানুষ করেছে। এই সত্য জানার পর তার ধর্মীয় গোঁড়ামি ভেঙে যায়। সে বুঝতে পারে জাতীয়তাবাদ মানে কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, বরং সব ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে প্রকৃত ভারতীয় হয়ে ওঠা।
iii. উদার জাতীয়তাবাদ: ‘গোরা’তে উদার, মানবতাবাদী, সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়েছে – হিন্দু-মুসলিম, ব্রাহ্ম-হিন্দু, নারী-পুরুষ সবার ঐক্য। সুচরিতা ও ললিতার মাধ্যমে নারী মুক্তির কথাও বলা হয়েছে।

তুলনা: ‘আনন্দমঠ’ ছিল সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক, যা বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করে, আর ‘গোরা’ ছিল উদার মানবতাবাদী জাতীয়তাবাদের প্রতীক, যা জাতীয়তাবাদের বিবর্তনকে তুলে ধরে। দুটি উপন্যাসই জাতীয়তাবাদ বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

4.5 গান্ধীজীর নেতৃত্বে জাতীয় আন্দোলনের প্রকৃতি আলোচনা করো – অহিংসা ও সত্যাগ্রহ।
উত্তর: মহাত্মা গান্ধী 1915 সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে 1920 থেকে 1947 পর্যন্ত জাতীয় আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা হয়ে ওঠেন। তাঁর আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল অহিংসা ও সত্যাগ্রহ।
সত্যাগ্রহ: সত্যাগ্রহ মানে সত্যের প্রতি আগ্রহ। গান্ধীজী বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও অহিংসার মাধ্যমে প্রতিরোধই হল সত্যাগ্রহ।
i. সত্যাগ্রহী অন্যায়কারীকে ঘৃণা করবে না, অন্যায়কে ঘৃণা করবে।
ii. সত্যাগ্রহী নিজে কষ্ট সহ্য করবে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে কখনও আঘাত করবে না। নিজের আত্মশক্তির দ্বারা শত্রুর হৃদয় পরিবর্তন করাই এর লক্ষ্য।
অহিংসা: অহিংসা মানে শুধু হিংসা না করা নয়, মনে-প্রাণে, চিন্তায়-কর্মে হিংসা ত্যাগ করা। গান্ধীজী বলেন অহিংসা দুর্বলের অস্ত্র নয়, এটি বীরের অস্ত্র। কাপুরুষ হিংসা থেকে পালাতে অহিংসার ভান করে, কিন্তু প্রকৃত বীর ক্ষমা করতে জানে।
আন্দোলনের প্রকৃতি:
i. গণভিত্তিক: গান্ধীজীর আগে কংগ্রেস ছিল অভিজাতদের দল। গান্ধীজী চরকা, খাদি, লবণ, খাজনা বন্ধের মতো সহজ কর্মসূচি দিয়ে কৃষক, শ্রমিক, নারী, ছাত্র, দলিত, ব্যবসায়ী সকলকে আন্দোলনে আনেন। তাঁর আন্দোলন ছিল সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন।
ii. অহিংস: অসহযোগ (1920-22), আইন অমান্য (1930-34), ভারত ছাড়ো (1942) – তিনটি আন্দোলনই ছিল অহিংস। যদিও চৌরিচৌরা (1922) ও ভারত ছাড়োতে কিছু হিংসা হয়েছিল।
iii. গঠনমূলক: তাঁর আন্দোলনে গঠনমূলক কাজ ছিল – খাদি, গ্রামোদ্যোগ, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, মদ্যপান নিষেধ। তিনি বলেন স্বরাজ মানে শুধু ব্রিটিশদের তাড়ানো নয়, সমাজের ভিতরের অন্যায় দূর করাও।
iv. সীমাবদ্ধতা: গান্ধীজী শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাস করতেন না। তিনি জমিদার-কৃষক, মালিক-শ্রমিকের মধ্যে ঐক্যের কথা বলতেন, তাই বামপন্থীরা তাঁর সমালোচনা করেন। হিংসা হলেই তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করতেন, যেমন চৌরিচৌরার পর, যা অনেক নেতা মানতে পারেননি।

তবুও গান্ধীজীর অহিংস সত্যাগ্রহই ভারতকে স্বাধীনতা এনে দেয় এবং বিশ্বে মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতাদের অনুপ্রাণিত করে।

Madhyamik History Model Answers-10

4.6 বাংলায় মতুয়া আন্দোলনের বিবরণ দাও – হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের ভূমিকা।
উত্তর: বাংলায় নমঃশূদ্রদের দলিত আন্দোলনই হল মতুয়া আন্দোলন।

ক) হরিচাঁদ ঠাকুর (1812-1878):
i. ফরিদপুর জেলার ওড়াকান্দি গ্রামে এক নমঃশূদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। নমঃশূদ্ররা তখন ‘চণ্ডাল’ নামে অস্পৃশ্য হিসাবে পরিচিত ছিল।
ii. তিনি ‘মতুয়া’ ধর্মমত প্রচার করেন। মতুয়া মানে হরি নামে মাতোয়ারা। তাঁর মূল বাণী ছিল – ‘হাতে কাম মুখে নাম’, ‘জাতিভেদ মানি না’, ‘শিক্ষা নাও, সংগঠিত হও’।
iii. তিনি হরিনাম, ভক্তি, সহজ ধর্মের কথা বলেন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদ, জাতিভেদ, পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, কাজ করেই ধর্ম পালন সম্ভব, সন্ন্যাস নেওয়ার দরকার নেই।
iv. তিনি নমঃশূদ্রদের মধ্যে আত্মসম্মান ও ঐক্য জাগিয়ে তোলেন।

খ) গুরুচাঁদ ঠাকুর (1846-1937): তিনি ছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র এবং মতুয়া আন্দোলনের প্রকৃত সংগঠক।
i. শিক্ষা বিস্তার: তিনি বুঝতে পারেন শিক্ষা ছাড়া দলিতদের মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি নমঃশূদ্রদের জন্য প্রায় 181টি স্কুল, পাঠশালা ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা করেন।
ii. সম্মেলন ও দাবি: 1911 সালে তিনি প্রথম নমঃশূদ্র সম্মেলন করেন এবং নমঃশূদ্রদের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি তোলেন। 1907 সালে তিনি নমঃশূদ্রদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি জানান।
iii. মতুয়া মহাসংঘ: 1932 সালে তিনি ‘মতুয়া মহাসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও বাংলার মতুয়াদের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন।
iv. রাজনৈতিক চেতনা: তিনি নমঃশূদ্রদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগান। 1937 সালে বাংলার আইনসভায় নমঃশূদ্র প্রতিনিধি পাঠাতে সক্ষম হন।
v. তাঁর শিষ্য যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল পরবর্তীতে ড. বি. আর. আম্বেদকরের সাথে যুক্ত হয়ে ‘তপশিলি ফেডারেশন’ গঠন করেন।

মতুয়া আন্দোলন বাংলার দলিতদের মধ্যে শিক্ষা, আত্মসম্মান ও রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলে এবং ভারতের বৃহত্তর দলিত আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে।

4.7 উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কী উদ্যোগ নেয়?
উত্তর: 1947 সালে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় 50 লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ (পূর্ব পাকিস্তান) থেকে আসে এবং এই আগমন 1971 সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। এটি ছিল রাজ্য সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
i. ত্রাণ ও শিবির: প্রথম দিকে বিধানচন্দ্র রায় সরকার শিয়ালদহ স্টেশন, ধুবুলিয়া, কুপার্স ক্যাম্প, বানপুর, রাণাঘাটে ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি করে। সেখানে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
ii. জবরদখল কলোনিকে স্বীকৃতি: উদ্বাস্তুরা নিজেরাই কলকাতার আশেপাশে ফাঁকা জমি জবরদখল করে প্রায় 150টি কলোনি গড়ে তোলে – যেমন যাদবপুর, বিজয়গড়, নেতাজিনগর, আজাদগড়, বাঘা যতীন, গড়িয়া, বেলঘরিয়া। প্রথমে সরকার এগুলিকে অবৈধ বললেও উদ্বাস্তুদের আন্দোলনের চাপে 1950-51 সালে বিধানচন্দ্র রায় সরকার এগুলিকে স্বীকৃতি দেয় এবং পরে জমির দলিল দেয়।
iii. ঋণ ও পুনর্বাসন: উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তর গঠন করা হয়। উদ্বাস্তুদের বাড়ি তৈরি, দোকান ও ব্যবসার জন্য ঋণ, জমির পাট্টা দেওয়া হয়।
iv. দণ্ডকারণ্য ও আন্দামান প্রকল্প: কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যৌথভাবে 1958 সালে দণ্ডকারণ্য প্রকল্প নেওয়া হয়। মধ্যপ্রদেশ ও ওড়িশার অনুন্নত দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে চাষের জমি দিয়ে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের চেষ্টা হয়। আন্দামানেও পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলার জলবায়ু, ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন পরিবেশের কারণে অনেক উদ্বাস্তু সেখানে যেতে চায়নি, ফলে প্রকল্পটি আংশিকভাবে ব্যর্থ হয়।
v. শিক্ষা ও চাকরি: স্কুল, কলেজে উদ্বাস্তু ছাত্রদের জন্য বিশেষ সুবিধা, চাকরিতে সংরক্ষণ এবং কলোনি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়।
vi. বামফ্রন্ট আমলে: 1978 সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে উদ্বাস্তু কলোনিগুলিকে স্থায়ী স্বীকৃতি দেয় এবং ‘অপারেশন বর্গা’র মাধ্যমে উদ্বাস্তু বর্গাদারদের জমির অধিকার দেয়। তবুও সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি, উদ্বাস্তুরা নিজেদের চেষ্টায় জীবন গড়ে তোলে।

Madhyamik History Model Answers-10

4.8 স্বাধীন ভারতে পরিকল্পনা কমিশন ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ভূমিকা লেখো।
উত্তর: স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সোভিয়েত রাশিয়ার অনুকরণে পরিকল্পিত অর্থনীতি গ্রহণ করেন।
পরিকল্পনা কমিশন: 1950 সালের 15 মার্চ নেহেরুর সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হয়। এর উপদেষ্টা ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। এর উদ্দেশ্য ছিল মিশ্র অর্থনীতি, সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ গঠন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং স্বনির্ভরতা অর্জন।

পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ভূমিকা:
i. প্রথম পরিকল্পনা (1951-56): এটি ছিল কৃষি ভিত্তিক পরিকল্পনা। কৃষি, সেচ ও বাঁধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভাকরা-নাঙ্গাল, দামোদর, হিরাকুদ বাঁধ তৈরি হয়। খাদ্য উৎপাদন বাড়ে এবং 3.6% বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়, তাই এটি সফল পরিকল্পনা ছিল।
ii. দ্বিতীয় পরিকল্পনা (1956-61): এটি ছিল মহলানবিশ মডেলের উপর ভিত্তি করে শিল্প ভিত্তিক পরিকল্পনা। ভারী শিল্প – ভিলাই (সোভিয়েত সাহায্যে), দুর্গাপুর (ব্রিটিশ সাহায্যে), রাউরকেলা (জার্মান সাহায্যে) ইস্পাত কারখানা, BHEL, HAL-এর মতো ভারী কারখানা গড়ে ওঠে। এর ফলে ভারতের শিল্পের ভিত্তি তৈরি হয়, কিন্তু কৃষি উপেক্ষিত হওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
iii. তৃতীয় পরিকল্পনা (1961-66): এর লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা এবং কৃষি ও শিল্পে ভারসাম্য। কিন্তু 1962 সালে চীন-ভারত যুদ্ধ, 1965 সালে পাক-ভারত যুদ্ধ, ভয়াবহ খরা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে এটি ব্যর্থ হয়। 1966-69 সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা ছুটি (Plan Holiday) ঘোষণা করা হয়।
iv. পরবর্তী পরিকল্পনা: চতুর্থ পরিকল্পনায় (1969-74) সবুজ বিপ্লব, ব্যাংক জাতীয়করণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ (গরিবি হটাও) কর্মসূচি নেওয়া হয়।

ভূমিকা ও অবসান: পরিকল্পনা কমিশন ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ভারতকে কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান, শিক্ষায় স্বনির্ভর করে। বড় বাঁধ, কারখানা, IIT, ISRO, BARC-এর মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়। তবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও আঞ্চলিক বৈষম্য পুরোপুরি মেটেনি। 2015 সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার পরিকল্পনা কমিশন বাতিল করে তার জায়গায় নীতি আয়োগ গঠন করে।

Madhyamik History Model Answers-10

বিভাগ – ঙ: ব্যাখ্যামূলক (8 নম্বর)

5.1 উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ আলোচনা করো।
উত্তর: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ মানে শুধু সাহিত্য ও ধর্ম সংস্কার নয়, এর প্রধান ভিত্তি ছিল যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান শিক্ষা। রাজা রামমোহন রায়ই প্রথম বলেন, ভারতের উন্নতির জন্য বেদ-বেদান্ত নয়, আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষা প্রয়োজন।

i. পাশ্চাত্য শিক্ষার সূচনা – সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ:
– হিন্দু কলেজ (1817): ডেভিড হেয়ার, রাধাকান্ত দেব, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়, যেখানে ইংরেজি, আধুনিক বিজ্ঞান, অঙ্ক পড়ানো হত। ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল ছাত্ররা এখানেই বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়ায়।
– কলকাতা মেডিকেল কলেজ (1835): এশিয়ার প্রথম মেডিকেল কলেজ, যেখানে মধুসূদন গুপ্ত প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেন এবং বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা শুরু হয়।
– শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (1842): ভারতের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হত।
রামমোহন রায় লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখে সংস্কৃত কলেজের বদলে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার দাবি জানান।

ii. সরকারি উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা: ব্রিটিশ সরকার বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেরানি তৈরি করা, ইঞ্জিনিয়ার নয়। কারণ ভারতীয়রা কারিগরি শিক্ষা শিখলে ব্রিটিশ শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতা করবে। তাই 1854 সালে উডের ডেসপ্যাচ (শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা) তে সাহিত্য, আইন, দর্শনের কথা বলা হয়, কিন্তু কারিগরি শিক্ষার কথা প্রায় বলা হয়নি। এর ফলে সরকারি উদ্যোগে বিজ্ঞান শিক্ষা খুব ধীরে এগোয়।

iii. জাতীয়তাবাদী উদ্যোগ – স্বদেশি বিজ্ঞান: বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের (1905) সময় বাঙালিরা বুঝতে পারে স্বদেশি শিল্পের জন্য নিজেদের ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন।
– জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও BTI (1906): 1906 সালের 1 মার্চ সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, তারকনাথ পালিত, রাসবিহারী ঘোষের উদ্যোগে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠিত হয়। এর অধীনে 1906 সালের 25 জুলাই ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (BTi. প্রতিষ্ঠা হয়। তারকনাথ পালিত 15 লক্ষ টাকা দান করেন। উদ্দেশ্য – ব্রিটিশ শিক্ষা বর্জন করে জাতীয়তাবাদী, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া। 1910 সালে BTI যাদবপুরে চলে যায় এবং 1928 সালে ‘কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ হয়, যা স্বাধীনতার পর 1955 সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় – ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়।

iv. বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠানের অবদান:
– ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ও IACS (1876): 1876 সালের 29 জুলাই কলকাতায় তিনি ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতীয়দের অর্থে, ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম প্রতিষ্ঠান। উদ্দেশ্য – বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করা। এখানেই 1928 সালে সি. ভি. রমন ‘রমন প্রভাব’ আবিষ্কার করে 1930 সালে নোবেল পান – বিজ্ঞানে ভারতের প্রথম নোবেল।
– রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ (1914): আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের দানে 1914 সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজ্ঞান কলেজ’ বা ‘রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ’ প্রতিষ্ঠা হয়। এখানে জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা পড়াতেন। এটি ছিল ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার প্রধান কেন্দ্র।
– বসু বিজ্ঞান মন্দির (1917): আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু 1917 সালে নিজের বাড়িতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন – উদ্ভিদের প্রাণ ও বেতার নিয়ে গবেষণা।
– বেঙ্গল কেমিক্যাল (1892): আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় 1892 সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠা করে স্বদেশি শিল্প ও ফলিত রসায়ন শিক্ষার ভিত্তি গড়েন।

গুরুত্ব: বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা বাংলায় কুসংস্কার দূর করে যুক্তিবাদ, স্বদেশি শিল্পের চেতনা ও জাতীয়তাবাদ জাগায় এবং স্বাধীন ভারতের ISRO, IIT, CSIR-এর ভিত্তি তৈরি করে।

Madhyamik History Model Answers-10

5.2 বাংলায় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস – রংপুর থেকে তেভাগা পর্যন্ত।
উত্তর: বাংলায় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনের সমান পুরনো। 1783 সালের রংপুর থেকে 1946 সালের তেভাগা পর্যন্ত প্রায় 160 বছর ধরে বাংলার কৃষকরা জমিদার, ইজারাদার, নীলকর ও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
i. রংপুর বিদ্রোহ (1783) – কোম্পানি আমলে প্রথম: ওয়ারেন হেস্টিংস 1773 সালে জমিদারি নিলামে ইজারা দেওয়ার প্রথা চালু করেন। রংপুরের ইজারাদার ছিলেন দেবী সিংহ, যিনি কৃষকদের উপর অতিরিক্ত কর চাপান। 1783 সালের জানুয়ারিতে নুরুলউদ্দিনের নেতৃত্বে কৃষকরা বিদ্রোহ করে, কোম্পানির অফিস ও কাছারি লুট করে। ব্রিটিশ সেনা দমন করলেও কর কমাতে বাধ্য হয়। এটি ছিল বাংলায় প্রথম সংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ।
ii. সন্ন্যাসী-ফকির (1763-1800) ও চুয়াড় বিদ্রোহ (1798-99): সন্ন্যাসী-ফকিররা (ভবানী পাঠক, মজনু শাহ) কোম্পানির তীর্থকর ও জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে 30 বছর ধরে লড়াই করে। বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ এর পটভূমি। চুয়াড়রা (দুর্জন সিংহ) জঙ্গলমহল মেদিনীপুর-বাঁকুড়ায় জমিদারি নিলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
iii. ওয়াহাবি-ফরাজী (1831-1847) – ধর্মীয় মোড়কে কৃষক আন্দোলন:
– তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (1831) – 24 পরগনার বারাসাতের নারকেলবেড়িয়ায় তিতুমীর বাঁশের কেল্লা তৈরি করে জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
– দুদু মিঞার ফরাজী আন্দোলন (1847) – হাজী শরীয়তউল্লাহর পুত্র দুদু মিঞা ঘোষণা করেন “জমির মালিক আল্লাহ, জমিদার নয়” এবং খাজনা বন্ধের ডাক দেন। দুটিই ধর্মীয় সংস্কার হিসাবে শুরু হলেও প্রকৃতিতে কৃষক আন্দোলন ছিল।
iv. সাঁওতাল বিদ্রোহ (1855-56): সিধু-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা দিকু (মহাজন), জমিদারের বিরুদ্ধে জমি রক্ষার জন্য বিদ্রোহ করে। 10,000 সাঁওতাল নিহত হয়।
v. নীল বিদ্রোহ (1859-60) – প্রথম সফল আন্দোলন: নদীয়ার গোবিন্দপুরে দিগম্বর-বিষ্ণু বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষকরা ঘোষণা করে “নীল চাষ করব না”। নীলকররা ‘দাদন’ দিয়ে 2 টাকা বিঘা দরে নীল চাষে বাধ্য করত। হিন্দু প্যাট্রিয়ট (হরিশ মুখার্জি), নীলদর্পণ (দীনবন্ধু মিত্র) এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। 1860 সালে নীল কমিশন নীল চাষ ঐচ্ছিক করে – বাংলায় নীল চাষ বন্ধ হয়। এটি ছিল প্রথম সফল কৃষক-মধ্যবিত্ত ঐক্যের আন্দোলন।
vi. বিংশ শতক – তেভাগা আন্দোলন (1946-47) – বৃহত্তম আন্দোলন:
1940 সালে ফ্লাউড কমিশন সুপারিশ করে বর্গাদারদের ফসলের 2/3 ভাগ (তেভাগা) দেওয়া উচিত, আধি নয়। 1946 সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভা (কমিউনিস্ট) উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, ময়মনসিংহে আন্দোলন শুরু করে। স্লোগান ছিল – ‘আধি নয় তেভাগা চাই, নিজ খামারে ধান তোলো’। নেতৃত্বে ছিলেন কম্পরাম সিং, ভবানী সেন, ইলা মিত্র, রামেন মিত্র। নারীরা লাঠি হাতে ধান কাটা পাহারা দিত। জমিদার ও পুলিশ নির্মমভাবে দমন করে, ইলা মিত্রকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। দেশভাগের কারণে আন্দোলন দুর্বল হয়, কিন্তু এর চাপে 1950 সালে বর্গাদারি আইন পাশ হয়, যা পরে 1978 সালে বামফ্রন্ট সরকারের ‘অপারেশন বর্গা’র ভিত্তি হয়।

উপসংহার: রংপুর থেকে তেভাগা পর্যন্ত এই দীর্ঘ আন্দোলন বাংলার কৃষকদের মধ্যে শ্রেণী চেতনা জাগায়, জাতীয় আন্দোলনকে গণ আন্দোলনে পরিণত করে এবং স্বাধীনতার পর ভূমি সংস্কারের পথ প্রশস্ত করে।

Madhyamik History Model Answers-10

5.3 স্বাধীন ভারতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন আন্দোলন ও তার ফলাফল আলোচনা করো।
উত্তর: স্বাধীনতার সময় ভারতের মানচিত্র ছিল ব্রিটিশদের তৈরি প্রদেশ অনুযায়ী – যেমন বোম্বে প্রেসিডেন্সিতে মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড় সবাই ছিল। কিন্তু কংগ্রেস 1920 সালে নাগপুর অধিবেশনে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই দাবি আরও জোরালো হয়।

পটভূমি:
i. স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ও সর্দার প্যাটেল ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের বিরোধী ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন এতে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হবে, বিচ্ছিন্নতাবাদ বাড়বে। তাই 1948 সালে ধার কমিশন ও 1948 সালে JVP কমিটি (জওহরলাল, বল্লভভাই, পট্টভি) ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের বিরোধিতা করে।
ii. কিন্তু দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে তেলেগু ভাষীরা পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। কারণ মাদ্রাজে তামিলদের আধিপত্য ছিল।

আন্দোলন:
i. পট্টি শ্রীরামুলুর অনশন ও মৃত্যু (1952): এই আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হল গান্ধীবাদী নেতা পট্টি শ্রীরামুলুর আমরণ অনশন। 1952 সালের 19 অক্টোবর থেকে তিনি মাদ্রাজে অন্ধ্রপ্রদেশের দাবিতে অনশন শুরু করেন। নেহেরু গুরুত্ব না দেওয়ায় 58 দিন অনশনের পর 1952 সালের 15 ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
ii. সারা ভারতে আগুন: তাঁর মৃত্যুর পর সারা অন্ধ্রে হিংসাত্মক বিক্ষোভ, রেল অবরোধ, অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামলাতে নেহেরু 1953 সালের 1 অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের ঘোষণা করেন। এটি ছিল স্বাধীন ভারতে প্রথম ভাষা ভিত্তিক রাজ্য, রাজধানী হয় কুর্নুল।
iii. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (1953): অন্ধ্রের পর সারা ভারতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের দাবি ওঠে – মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পাঞ্জাব, কেরালা। বাধ্য হয়ে সরকার 1953 সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ গঠন করে। সদস্য ছিলেন হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কে. এম. পানিক্কর।
iv. কমিশনের রিপোর্ট (1955): কমিশন 1955 সালে রিপোর্ট দেয় – ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন করা যায়, তবে তা জাতীয় ঐক্য, প্রশাসনিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক দিক দেখে করতে হবে। শুধু ভাষা নয়, অন্য বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ফলাফল:
i. 1956 সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইন: এই রিপোর্টের ভিত্তিতে 1956 সালের 1 নভেম্বর ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’ পাশ হয়। এর ফলে 14টি রাজ্য ও 6টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হয়। মাদ্রাজ থেকে কেরালা, কর্ণাটক, অন্ধ্র আলাদা হয়।
ii. পরবর্তী বিভাজন: এর পরেও ভাষা আন্দোলন চলতে থাকে –
– 1960 সালে বোম্বে থেকে মহারাষ্ট্র (মারাঠি) ও গুজরাট (গুজরাটি) আলাদা হয়।
– 1966 সালে পাঞ্জাব থেকে হরিয়ানা (হিন্দি) ও হিমাচল আলাদা হয় এবং পাঞ্জাব পাঞ্জাবি ভাষীদের রাজ্য হয়।
– পরে 2000 সালে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড এবং 2014 সালে তেলেঙ্গানা গঠিত হয়।
iii. সুফল ও কুফল: ভাষা ভিত্তিক রাজ্য গঠনের ফলে আঞ্চলিক ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ হয়, প্রশাসন মানুষের কাছে পৌঁছায়, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু এর কুফল হিসাবে আঞ্চলিকতাবাদ, ভাষা দাঙ্গা (যেমন 1960-এ আসামে বাংলা-অসমীয়া দাঙ্গা), বিচ্ছিন্নতাবাদও বাড়ে।

উপসংহার: ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন ছিল ভারতের গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক সাহসী পরীক্ষা, যা ভারতকে ভেঙে দেয়নি, বরং ঐক্যবদ্ধ ভারতে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

—


Discover more from NIRYAS.IN

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page

Discover more from NIRYAS.IN

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading