Madhyamik History Model Answers-5/2
Madhyamik History Model Answers-5
মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ? ইতিহাস বিষয়ে 90-এ 90 পাওয়ার স্বপ্ন দেখছ? তাহলে তোমার এই প্রস্তুতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে আমরা নিয়ে এসেছি মাধ্যমিক (ইতিহাস) (Madhyamik History Model Answers-5) (উত্তরসহ)।নতুন ও আপডেটেড সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি এই মডেল প্রশ্নপত্রটিতে রয়েছে বিভাগ – ক: 20 নম্বরের 20টি MCQ (ব্যাখ্যা সহ), বিভাগ – খ: 16 নম্বরের 16টি অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (1 নম্বরের), বিভাগ – গ: 22 নম্বরের 11টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (2 নম্বরের) এবং বিভাগ – ঘ: 24 নম্বরের 6টি বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন (4 নম্বরের) ও বিভাগ – ঙ: 8 নম্বরের 1টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন (8 নম্বরের) সহ প্রতিটি বিভাগের নির্ভুল ও সম্পূর্ণ সমাধান।। প্রতিটি উত্তরের সাথে উৎস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই মূল পাঠ্যবইয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে।
Madhyamik History Model Answers-5

ইতিহাস(History)
(Part- 2)
বিভাগ – ঘ: বিশ্লেষণধর্মী
4.1 বাংলায় নবজাগরণে ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গলের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: বাংলার নবজাগরণে সবচেয়ে আপোসহীন যুক্তিবাদী ধারাটি নিয়ে এসেছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (1809-1831)। তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক (1826-31)।
তাঁর শিক্ষা: তিনি ছাত্রদের মুখস্থ বিদ্যার বদলে ফরাসি বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার আদর্শ, টম পেইনের যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মুক্তচিন্তা শেখাতেন। তিনি বলতেন – “কোনো কিছুই বিনা প্রশ্নে মেনে নিও না”।
ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী: তাঁর শিষ্যদের নিয়েই গড়ে ওঠে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা ‘নব্যবঙ্গ’ গোষ্ঠী। এর প্রধানরা ছিলেন – কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার (এভারেস্টের উচ্চতা মাপেন), রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচাঁদ মিত্র, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
তাদের কাজ:
i. তারা হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ ও কৌলীন্য প্রথার তীব্র সমালোচনা করতেন।
ii. তারা ‘এনকোয়ারার’, ‘পার্থেনন’, ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা প্রকাশ করে মুক্তচিন্তা ও নারী শিক্ষার পক্ষে প্রচার চালাতেন।
iii. তারা প্রকাশ্যে গোমাংস ভক্ষণ ও মদ্যপান করে প্রচলিত সমাজকে আঘাত দিতে চেয়েছিলেন।
সীমাবদ্ধতা: তাদের প্রধান দুর্বলতা ছিল তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাদের আন্দোলন শুধু কলকাতার উচ্চবর্ণের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সীমিত ছিল, কৃষক-শ্রমিক ও মুসলিম সমাজে পৌঁছায়নি। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের জন্য রক্ষণশীল সমাজ তাদের ‘নাস্তিক’ বলত। তবুও তারাই বাংলায় প্রথম যুক্তিবাদ ও আধুনিকতার বীজ বপন করেছিলেন।
4.2 1857 মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর: 1857 সালের মহাবিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে প্রথম বৃহৎ ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ হলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। এর বহু কারণ ছিল।
i. সীমিত অঞ্চল: বিদ্রোহটি সর্বভারতীয় রূপ নেয়নি। এটি মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতে – দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, বেরিলি ও বিহারে সীমিত ছিল। বাংলা, বোম্বে, মাদ্রাজ, পাঞ্জাব, রাজস্থান বিদ্রোহে যোগ দেয়নি।
ii. নেতৃত্বে অনৈক্য ও লক্ষ্যের অভাব: বিদ্রোহের কোনো সর্বভারতীয় নেতা বা সুপরিকল্পিত কর্মসূচি ছিল না। বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন দুর্বল বৃদ্ধ, নানা সাহেব পেশোয়া পদ ফিরে পেতে চাইছিলেন, রানি লক্ষ্মীবাই ঝাঁসি ফিরে পেতে চাইছিলেন। তাদের মধ্যে কোনো অভিন্ন জাতীয় লক্ষ্য ছিল না।
iii. শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অসহযোগিতা: বাংলার শিক্ষিত বাঙালি, বোম্বাইয়ের বুদ্ধিজীবী এবং শিখ ও গোর্খা সেনারা এই বিদ্রোহকে সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া মনে করে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়।
iv. অস্ত্র ও সংগঠনে দুর্বলতা: সিপাহীদের কাছে ছিল পুরনো মাস্কেট ও তলোয়ার, অন্যদিকে ব্রিটিশদের ছিল আধুনিক এনফিল্ড রাইফেল, কামান, এবং দ্রুত সেনা পাঠানোর জন্য রেল ও টেলিগ্রাফ।
v. সুসংগঠনের অভাব: বিদ্রোহীদের মধ্যে যোগাযোগ, অর্থ ও রসদের অভাব ছিল। ব্রিটিশরা কূটনীতি ও শক্তি দিয়ে একে একে সব কেন্দ্র দখল করে নেয়। এই কারণে 1858 সালের মাঝামাঝি বিদ্রোহ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়।
4.3 বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার বিকাশে জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অবদান লেখো।
উত্তর: উনিশ শতকের শেষে বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার দুই প্রধান পথিকৃৎ হলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তাঁরা প্রমাণ করেন বিজ্ঞান চর্চায় ভারতীয়রাও বিশ্বের সেরা হতে পারে।
ক) আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু (1858-1937):
i. তিনি পদার্থবিজ্ঞানী হিসাবে বেতার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করেন। 1895 সালে তিনি বিনা তারে বেতার বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন, যা মার্কনির আবিষ্কারের বহু আগে।
ii. তিনি উদ্ভিদবিদ হিসাবে ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ নামে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, উদ্ভিদও আঘাত ও উত্তেজনায় সাড়া দেয়।
iii. 1917 সালে তিনি নিজের বাড়িতে ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতের প্রথম আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। এখানে সি. ভি. রমন, মেঘনাদ সাহা গবেষণা করেন।
খ) আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (1861-1944):
i. তিনি ছিলেন রসায়নবিদ। 1892 সালে তিনি ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতের প্রথম দেশীয় ওষুধ ও রাসায়নিক কারখানা।
ii. তিনি ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’ (History of Hindu Chemistry) গ্রন্থ লিখে প্রমাণ করেন প্রাচীন ভারতেও উন্নত রসায়ন চর্চা হত।
iii. তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক হিসাবে মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী তৈরি করেন। তিনি স্বদেশি আন্দোলনে বিজ্ঞানকে যুক্ত করেন এবং নিজের উপার্জন দরিদ্র ছাত্রদের দান করতেন।
4.4 জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ‘গোরা’ উপন্যাসের গুরুত্ব লেখো।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ (1910) উপন্যাসটি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের (1905) পটভূমিতে লেখা এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণায় এক নতুন ও উদার ব্যাখ্যা দেয়।
i. জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা: উপন্যাসের নায়ক গোরা প্রথমে একজন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ছিল, যে ব্রাহ্ম সমাজ ও খ্রিস্টান ধর্মের বিরোধী। কিন্তু উপন্যাসের শেষে সে জানতে পারে সে আসলে একজন আইরিশ দম্পতির সন্তান, তাকে এক হিন্দু পরিবার মানুষ করেছে। এই সত্য জানার পর গোরা বুঝতে পারে জাতীয়তাবাদ মানে কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, বরং সকল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে ‘ভারতীয়’ হয়ে ওঠা।
ii. ব্রাহ্ম সমাজ ও সমাজ সংস্কার: উপন্যাসে ব্রাহ্ম সমাজের আচার-বিচার, জাতিভেদ প্রথা এবং হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
iii. নারী মুক্তি: সুচরিতা ও ললিতার চরিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ নারী শিক্ষা, নারীর স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশের কথা বলেছেন।
iv. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা: হিন্দু-মুসলিম, ব্রাহ্ম-হিন্দু দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে কীভাবে প্রকৃত ভারতবর্ষকে খুঁজে পাওয়া যায়, ‘গোরা’ তারই কাহিনী। এই উদার, মানবতাবাদী জাতীয়তাবাদ চরমপন্থী ও বিপ্লবী যুবকদের মধ্যে সংকীর্ণ হিন্দু জাতীয়তাবাদের বদলে এক বৃহত্তর দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগায়।
Madhyamik History Model Answers-5
4.5 অসহযোগ আন্দোলনে শ্রমিক ও কৃষকদের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: 1920-22 সালের অসহযোগ আন্দোলন ছিল গান্ধীজীর নেতৃত্বে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন, যেখানে প্রথমবারের মতো কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি বড় সংখ্যায় যোগ দেয় এবং কংগ্রেস শহুরে মধ্যবিত্তের দল থেকে জনগণের দলে পরিণত হয়।
কৃষকদের ভূমিকা:
i. উত্তরপ্রদেশের হারদোই, বাহরাইচ, সীতাপুর অঞ্চলে মাদারি পাশির নেতৃত্বে ‘একা আন্দোলন’ (1921-22) শুরু হয়। কৃষকরা জমিদারদের অতিরিক্ত খাজনা ও বেগার প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং একে অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত করে।
ii. বিহারে স্বামী সহজানন্দ সরস্বতীর নেতৃত্বে ‘কৃষক সভা’ গড়ে ওঠে এবং কৃষকরা খাজনা বন্ধের ডাক দেয়।
iii. বাংলার মেদিনীপুর, কাঁথি, উত্তরপ্রদেশে কৃষকরা ইউনিয়ন বোর্ড বয়কট ও খাজনা বন্ধ আন্দোলন করে।
শ্রমিকদের ভূমিকা:
i. বোম্বে, কানপুর, আহমেদাবাদ, মাদ্রাজ ও জামশেদপুরে শ্রমিক ধর্মঘট হয়। তারা বিদেশি কাপড় বর্জন ও মদ দোকানে পিকেটিং করে।
ii. 1920 সালে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে ‘নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’ (AITUC) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শ্রমিকদের সংগঠিত করে।
iii. শ্রমিকরা তিলক স্বরাজ তহবিলে অর্থ দান করে এবং চরকা কাটায় অংশ নেয়।
তবে 1922 সালে চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধীজী হঠাৎ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে কৃষক-শ্রমিকরা হতাশ হয়ে পড়ে।
Madhyamik History Model Answers-5
4.6 বাংলায় মহিষ্য আন্দোলনের বিবরণ দাও।
উত্তর: মহিষ্যরা হল বাংলার মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি ও 24 পরগনার একটি বৃহৎ চাষি ও জেলে সম্প্রদায়। তারা বাংলার অন্যতম প্রধান মধ্যবিত্ত কৃষক জাতি।
কারণ: 1901 সালের জনগণনায় ব্রিটিশ সরকার এবং ব্রাহ্মণ্য সমাজ তাদের ‘চাষি কৈবর্ত’ ও শূদ্র হিসাবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এই সময়ে মহিষ্যরা আর্থিকভাবে উন্নত, শিক্ষিত এবং জমির মালিক হয়ে উঠেছিল। তাই তারা এই নিম্নবর্ণের পরিচয় মানতে অস্বীকার করে এবং নিজেদের ক্ষত্রিয় হিসাবে স্বীকৃতি দাবি করে।
আন্দোলনের ধারা:
i. 1910 সালে তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ‘মহিষ্য সমিতি’ গঠিত হয়।
ii. তারা পৈতা ধারণ, ক্ষত্রিয় আচার-অনুষ্ঠান পালন, বাল্যবিবাহ বন্ধ ও বিধবা বিবাহ প্রচলন শুরু করে নিজেদের উচ্চবর্ণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
iii. 1920-30 এর দশকে তারা নিজেদের মধ্যে বহু স্কুল, কলেজ, ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা করে এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি তোলে।
ফল: তাদের নিরন্তর আন্দোলনের ফলে 1931 সালের জনগণনায় ব্রিটিশ সরকার তাদের ক্ষত্রিয় হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এটি ছিল বাংলায় একটি মধ্যবিত্ত কৃষক জাতির জাতপাতের বিরুদ্ধে আত্মসম্মান ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য সংগঠিত আন্দোলন।
4.7 উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলি লেখো।
উত্তর: 1947 সালে দেশভাগের ফলে প্রায় 1 কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গে প্রায় 50 লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ থেকে আসে। এটি ছিল স্বাধীন ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ।
i. ত্রাণ ও শিবির: প্রথম দিকে সরকার শিয়ালদহ স্টেশন, ধুবুলিয়া, বানপুর, কুপার্স ক্যাম্প, বনগাঁয় ট্রানজিট ক্যাম্প ও ত্রাণ শিবির খোলে।
ii. জবরদখল কলোনিকে স্বীকৃতি: কলকাতার আশেপাশে উদ্বাস্তুরা নিজেরাই ফাঁকা জমি জবরদখল করে প্রায় 150টি কলোনি গড়ে তোলে – যেমন যাদবপুর, বিজয়গড়, নেতাজিনগর, আজাদগড়, বাঘাযতীন। প্রথমে সরকার এগুলিকে অবৈধ বললেও, উদ্বাস্তুদের আন্দোলনের চাপে 1950-51 সালে এগুলিকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
iii. ঋণ ও পুনর্বাসন: উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তর গঠন করা হয়। উদ্বাস্তুদের বাড়ি তৈরি, দোকান ও ব্যবসার জন্য ঋণ, জমির পাট্টা দেওয়া হয়।
iv. দণ্ডকারণ্য ও আন্দামান প্রকল্প: 1958 সালে সরকার মধ্যপ্রদেশ-ওড়িশার অনুন্নত দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে চাষের জমি দিয়ে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের প্রকল্প নেয়। আন্দামানেও পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলার জলবায়ু থেকে ভিন্ন পরিবেশ এবং ভাষার সমস্যার কারণে অনেক উদ্বাস্তু সেখানে যেতে চায়নি, ফলে প্রকল্পটি আংশিকভাবে ব্যর্থ হয়।
v. শিক্ষা ও চাকরি: স্কুল, কলেজে উদ্বাস্তু ছাত্রদের জন্য আসন সংরক্ষণ ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। তবুও বাংলায় উদ্বাস্তু সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, কারণ পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু আগমন 1971 সাল পর্যন্ত চলতে থাকে।
4.8 স্বাধীনতার পর ভারতে শিক্ষা ক্ষেত্রে কী কী সংস্কার হয়?
উত্তর: স্বাধীনতার পর ভারত সরকার শিক্ষাকে জাতি গঠন ও উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করে এবং একাধিক কমিশন গঠন করে।
i. রাধাকৃষ্ণন কমিশন (1948-49): স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষা কমিশন। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সংস্কারের জন্য এটি গঠিত হয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং 1956 সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) গঠনের সুপারিশ করে।
ii. মুদালিয়র কমিশন (1952-53): ড. লক্ষ্মণস্বামী মুদালিয়রের নেতৃত্বে মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারের জন্য এটি গঠিত হয়। এটি 3 বছরের মাধ্যমিক কোর্স, বহুমুখী বিদ্যালয় (বিজ্ঞান, কারিগরি, বাণিজ্য) এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার কথা বলে।
iii. কোঠারি কমিশন (1964-66): এটি ছিল স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কমিশন। ড. ডি. এস. কোঠারির নেতৃত্বে এই কমিশন 10+2+3 শিক্ষা কাঠামো, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, প্রতিবেশী স্কুলের ধারণা, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষায় 6% বাজেট ব্যয়ের সুপারিশ করে। এর ভিত্তিতেই 1968 সালে ভারতের প্রথম জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি হয়।
iv. কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষা: 1951 সালে খড়গপুরে প্রথম IIT, পরে বোম্বে, কানপুর, মাদ্রাজ, দিল্লিতে IIT, IIM, NCERT (1961), ISRO, CSIR-এর সম্প্রসারণ ঘটে।
এর ফলে ভারতে সাক্ষরতা 1951 সালে 18% থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় 77% হয়েছে, যদিও এখনও গুণগত মান ও বৈষম্যের সমস্যা রয়ে গেছে।
Madhyamik History Model Answers-5
বিভাগ – ঙ: ব্যাখ্যামূলক (8×1=8)
5.1 মানব প্রকৃতি ও বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে ছাপাখানার ভূমিকা ও বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অবদান লেখো।
উত্তর:
ক) মানব প্রকৃতি ও বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে ছাপাখানার ভূমিকা:
ছাপাখানা ছিল উনিশ শতকে বাংলায় মানব প্রকৃতির পরিবর্তন ও বিজ্ঞান শিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। ছাপাখানার আগে জ্ঞান ছিল মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও ধনী মানুষের হাতে পুঁথি আকারে বন্দি। ছাপাখানা এসে জ্ঞানকে সস্তা ও গণমুখী করে দেয়।
i. বিকাশের ইতিহাস: 1778 সালে চার্লস উইলকিন্স বাঙালি কারিগর পঞ্চানন কর্মকারের সাহায্যে প্রথম বাংলা হরফ তৈরি করেন। 1800 সালে শ্রীরামপুরে উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে বাইবেল, প্রথম বাংলা গদ্য বই ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’, প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’ (1818) ও সাময়িকী ‘দিগদর্শন’ (1818) ছাপা হয়। 1818 সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রথম বাঙালি হিসাবে ‘ফেরিস অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘বাঙ্গাল গেজেট’ প্রকাশ করেন।
ii. শিক্ষা বিস্তারে বৈপ্লবিক ভূমিকা: ছাপাখানার ফলে বইয়ের দাম 10 ভাগের 1 ভাগে নেমে আসে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ (1855) মাত্র 1 আনায় বিক্রি হত, ফলে লক্ষ লক্ষ গরিব ছাত্র প্রাথমিক শিক্ষা পায়। ‘স্কুল বুক সোসাইটি’র মাধ্যমে অক্ষয়কুমার দত্তের বিজ্ঞান বই ‘চারুপাঠ’, রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মানচিত্র, ইতিহাস-ভূগোল বই সাধারণ ছাত্রের হাতে পৌঁছায়। এর ফলে গণশিক্ষা সম্ভব হয়।
iii. বিজ্ঞান চেতনা ও যুক্তিবাদ: ‘বঙ্গদর্শন’, ‘বামাবোধিনী’, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি ছাপা হয়। মানুষ কুসংস্কার ছেড়ে যুক্তিবাদী হতে শেখে। মানব প্রকৃতির মধ্যে প্রশ্ন করার, বিচার করার শক্তি জাগে।
iv. আধুনিক ছাপা প্রযুক্তি: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী 1895 সালে ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠা করে ভারতে প্রথম হাফটোন ব্লক, রঙিন ছাপা ও ডায়োটাইপ প্রযুক্তি নিয়ে আসেন। এর ফলে ছবি সহ বিজ্ঞান বই, শরীর বিদ্যা, উদ্ভিদ বিদ্যার বই ছাপা সম্ভব হয়। তাঁর ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ছবি সহ বিজ্ঞান কাহিনি শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা জাগায়।
সংক্ষেপে, ছাপাখানা ছাড়া বাংলার নবজাগরণ, বিজ্ঞান শিক্ষা ও মানবতাবাদী চেতনার বিকাশ অসম্ভব ছিল।
খ) বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অবদান:
প্রতিষ্ঠা: আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু (1858-1937) ছিলেন বিশ্বের প্রথম সারির বিজ্ঞানী। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার সময় তিনি বিনা তারে বেতার বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন, যা মার্কনিরও আগে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাঁকে পর্যাপ্ত সাহায্য দেয়নি। তাই তিনি নিজের জমানো অর্থ, পৈতৃক সম্পত্তি দিয়ে 1917 সালের 30 নভেম্বর তাঁর নিজের জন্মদিনে কলকাতার আপার সার্কুলার রোডে নিজের বাড়িতে ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম বেসরকারি ও ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।
অবদান:
i. উদ্দেশ্য – স্বদেশি বিজ্ঞান: তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল – “ভারতীয়দের দ্বারা, ভারতের জন্য বিজ্ঞান গবেষণা”। তিনি প্রমাণ করতে চান, বিজ্ঞান চর্চার জন্য ব্রিটিশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার দরকার নেই, ভারতীয়রাও মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা করতে পারে।
ii. মৌলিক গবেষণা: তিনি এখানে দুটি যুগান্তকারী গবেষণা করেন –
– বেতার বিজ্ঞান: তিনি গ্যালেনা ডিটেক্টর আবিষ্কার করেন, যা আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও রেডিওর ভিত্তি।
– উদ্ভিদের প্রাণ: তিনি ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ নামে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র আবিষ্কার করেন, যা এক সেকেন্ডের এক হাজার ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধিও মাপতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, উদ্ভিদও ব্যথা, আলো, তাপে সাড়া দেয়, ক্লান্ত হয়। এটি মানব প্রকৃতি ও উদ্ভিদ জগতের মধ্যে এক গভীর ঐক্য স্থাপন করে এবং ভারতীয় দর্শনের “সর্বভূতে এক আত্মা” ধারণাকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করে।
iii. গবেষক তৈরির কেন্দ্র: এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতের বিজ্ঞানীদের মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সি. ভি. রমন এখানে বসেই 1928 সালে ‘রমন প্রভাব’ আবিষ্কার করে 1930 সালে নোবেল পান। মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্রমোহন বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ এখানে গবেষণা করেন।
iv. আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ প্রেরণা: বসু বিজ্ঞান মন্দির ভারতীয় বিজ্ঞানীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এটি প্রমাণ করে ভারত বিশ্বমানের মৌলিক গবেষণা করতে পারে। স্বাধীনতার পর ISRO, DRDO, BARC-এর মতো প্রতিষ্ঠান এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠে।
সুতরাং, ছাপাখানা বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় ও গণমুখী করেছে, আর বসু বিজ্ঞান মন্দির বিজ্ঞানকে গবেষণামুখী ও বিশ্বমানের করেছে – দুটিই মানব প্রকৃতি ও বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে অপরিহার্য।
Madhyamik History Model Answers-5
5.2 ভারতে বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস – শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন।
উত্তর: ভারতে বামপন্থী আন্দোলন বলতে কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শে শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণী সংগ্রামকে বোঝায়। জাতীয় আন্দোলন যখন মূলত মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে স্বাধীনতার কথা বলছিল, তখন বামপন্থীরা শ্রমিক-কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমাজতন্ত্রের কথা বলে।
শুরু:
i. তাসখন্দে কমিউনিস্ট পার্টি (1920): ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানবেন্দ্রনাথ রায় (M.N. Roy)। তিনি মেক্সিকো থেকে সোভিয়েত রাশিয়ায় যান এবং 1920 সালের 17 অক্টোবর তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। লেনিনের সাথে তাঁর বৈঠক হয়।
ii. ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি (1925): 1925 সালের ডিসেম্বরে কানপুরে সত্যভক্ত, মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, শওকত উসমানি ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন।
ক) শ্রমিক আন্দোলনে বামপন্থীরা:
i. সূচনা: ভারতে প্রথম শ্রমিক সংগঠন 1890 সালে নারায়ণ লোখান্ডের ‘বোম্বে মিল হ্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন’, কিন্তু তা কল্যাণমূলক ছিল। বামপন্থী শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা হয় 1920 সালের 31 অক্টোবর ‘নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’ (AITUC) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর সভাপতি ছিলেন লালা লাজপত রায়, কিন্তু এর মধ্যে কমিউনিস্টদের প্রভাব ছিল।
ii. বোম্বের ধর্মঘট (1928): বামপন্থীদের নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 1928 সালে বোম্বেতে 6 মাসের ঐতিহাসিক ধর্মঘট। প্রায় 1 লক্ষ শ্রমিক অংশ নেয়। কমিউনিস্ট নেতা এস. এ. ডাঙ্গে, মুজফফর আহমেদ, ফিলিপ স্প্র্যাট এর নেতৃত্ব দেন।
iii. WPP ও মিরাট মামলা: 1928 সালে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের মধ্যে থেকে শ্রমিক-কৃষকদের জন্য ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি’ (WPP) গঠন করে। ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়ে 1929 সালে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় 32 জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেপ্তার করে 4 বছর জেলে রাখে। কিন্তু এর ফলে কমিউনিস্টরা আরও জনপ্রিয় হয় এবং শ্রমিকদের মধ্যে তাদের ভিত্তি শক্ত হয়।
iv. 1946 নৌ বিদ্রোহ: 1946 সালের ফেব্রুয়ারিতে বোম্বেতে নৌ বিদ্রোহ হলে বোম্বের 2 লক্ষ শ্রমিক তাদের সমর্থনে ধর্মঘট করে, যা ছিল শ্রমিক-সেনা ঐক্যের বিরল উদাহরণ।
খ) কৃষক আন্দোলনে বামপন্থীরা:
i. কিষাণ সভা (1936): 1936 সালের এপ্রিলে লক্ষ্ণৌতে স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী ও এন. জি. রঙ্গার নেতৃত্বে ‘সর্বভারতীয় কিষাণ সভা’ গঠিত হয়। এটি ছিল বামপন্থী কৃষক সংগঠন, যা জমিদারি উচ্ছেদ ও কৃষকের অধিকারের দাবি তোলে।
ii. তেভাগা আন্দোলন (1946-47): উত্তরবঙ্গে ফসলের 2/3 ভাগ বর্গাদারের দাবিতে কমিউনিস্ট পার্টি ও কিষাণ সভা নেতৃত্ব দেয়। নেতা ছিলেন ইলা মিত্র, রামেন মিত্র। এটি ছিল বামপন্থী কৃষক আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
iii. তেলেঙ্গানা আন্দোলন (1946-51): হায়দ্রাবাদের নিজামের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে কৃষক সশস্ত্র সংগ্রাম। কৃষকরা জমিদারের জমি দখল করে নিজেদের মধ্যে বিলি করে দেয়। স্বাধীন ভারতের সেনা পাঠিয়ে এই আন্দোলন দমন করে।
গুরুত্ব: বামপন্থীরা জাতীয় আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমিত না রেখে শ্রমিক-কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে। তাদের চাপেই স্বাধীন ভারতে শ্রমিক আইন (8 ঘণ্টা কাজ, বোনাস), জমিদারি উচ্ছেদ, বর্গাদারি আইন ও ভূমি সংস্কার সম্ভব হয়।
Madhyamik History Model Answers-5
5.3 স্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রনীতি – পঞ্চশীল, জোট নিরপেক্ষতা ও তার বিবর্তন।
উত্তর: স্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির স্থপতি ছিলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু (1947-64)।
পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য:
i. সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরোধিতা: ভারত নিজে দীর্ঘদিন পরাধীন ছিল, তাই এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলির স্বাধীনতাকে সমর্থন করা।
ii. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও জাতিসংঘে আস্থা: যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান।
iii. বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতা: দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ভারত প্রথম প্রতিবাদ করে।
পঞ্চশীল নীতি (1954):
1954 সালের 29 এপ্রিল ভারত ও চীনের মধ্যে তিব্বত নিয়ে চুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ও চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই 5টি নীতি গ্রহণ করেন, একে পঞ্চশীল বলে –
i. একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে পারস্পরিক সম্মান।
ii. অনাক্রমণ – একে অপরকে আক্রমণ না করা।
iii. অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।
iv. সমতা ও পারস্পরিক সুবিধা।
v. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
1955 সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং সম্মেলনে এশিয়া-আফ্রিকার 29টি দেশ পঞ্চশীলকে বিশ্ব শান্তির মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করে।
জোট নিরপেক্ষতা (NAM):
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দুটি শিবিরে ভাগ ছিল – আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী জোট (NATO) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক জোট (ওয়ারশ প্যাক্ট)। এই ঠান্ডা যুদ্ধের সময় নেহেরু বলেন ভারত কোনো জোটে যাবে না, স্বাধীনভাবে নিজের বিদেশ নীতি পরিচালনা করবে। একে জোট নিরপেক্ষতা বলে।
ভারতের ভূমিকা:
i. 1961 সালের সেপ্টেম্বরে যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেডে প্রথম NAM সম্মেলন হয়। নেহেরু, মিশরের নাসের, যুগোস্লাভিয়ার টিটো, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। 25টি দেশ যোগ দেয়। আজ NAM-এ 120টি দেশ।
ii. ভারতের লাভ: উভয় জোট থেকে সাহায্য পায় – আমেরিকা থেকে খাদ্য সাহায্য (PL 480) এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ভিলাই ইস্পাত কারখানা, ভাকরা বাঁধে সাহায্য। ভারত তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিবর্তন:
i. 1962 সালের ধাক্কা: 1962 সালে চীন ভারত আক্রমণ করলে পঞ্চশীল ভেঙে যায়। চীন পঞ্চশীল লঙ্ঘন করে। এই সময়ে NAM দেশগুলি ভারতকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেনি, ফলে জোট নিরপেক্ষতার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। ভারত আমেরিকা ও ব্রিটেনের কাছে অস্ত্র সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়।
ii. 1971 সালে পরিবর্তন: 1971 সালে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় আমেরিকা পাকিস্তানকে সমর্থন করলে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে 20 বছরের ‘শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি’ করে। এর ফলে ভারত কিছুটা সোভিয়েতপন্থী হয়ে পড়ে, বিশুদ্ধ জোট নিরপেক্ষতা থেকে সরে আসে।
iii. 1991 সালের পর: 1991 সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে ও ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে NAM এর গুরুত্ব কমে যায়। বিশ্ব একমেরু হয়ে যায়।
iv. বর্তমান: বর্তমানে ভারত বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি (Multi-alignment) নেয় – আমেরিকা, রাশিয়া, ইসরায়েল, ফ্রান্স সবার সাথে সম্পর্ক রাখে, তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জোট নিরপেক্ষতার আদর্শ – স্বাধীন সিদ্ধান্তের নীতিকে ধরে রেখেছে।
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.