Madhyamik History Model Answers-6/2
Madhyamik History Model Answers-6
মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ? ইতিহাস বিষয়ে 90-এ 90 পাওয়ার স্বপ্ন দেখছ? তাহলে তোমার এই প্রস্তুতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে আমরা নিয়ে এসেছি মাধ্যমিক (ইতিহাস) (Madhyamik History Model Answers-6) (উত্তরসহ)।নতুন ও আপডেটেড সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি এই মডেল প্রশ্নপত্রটিতে রয়েছে বিভাগ – ক: 20 নম্বরের 20টি MCQ (ব্যাখ্যা সহ), বিভাগ – খ: 16 নম্বরের 16টি অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (1 নম্বরের), বিভাগ – গ: 22 নম্বরের 11টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (2 নম্বরের) এবং বিভাগ – ঘ: 24 নম্বরের 6টি বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন (4 নম্বরের) ও বিভাগ – ঙ: 8 নম্বরের 1টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন (8 নম্বরের) সহ প্রতিটি বিভাগের নির্ভুল ও সম্পূর্ণ সমাধান।। প্রতিটি উত্তরের সাথে উৎস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই মূল পাঠ্যবইয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে।
Madhyamik History Model Answers-6

ইতিহাস(History)
(Part- 2)
বিভাগ – ঘ: বিশ্লেষণধর্মী
4.1 ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারমূলক কাজগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (1820-1891) ছিলেন বাংলার নবজাগরণের সবচেয়ে মানবতাবাদী ও আপোসহীন সমাজ সংস্কারক। তাঁকে ‘বাংলার নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব’ বলা হয়।
i. বিধবা বিবাহ আন্দোলন: এটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তিনি শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে হিন্দু শাস্ত্রে, বিশেষ করে পরাশর সংহিতায় বিধবা বিবাহের বিধান আছে। 1855 সালে তিনি এ নিয়ে পুস্তিকা লেখেন এবং প্রায় 1000 স্বাক্ষর সহ আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠান। তাঁর নিরলস চেষ্টায় লর্ড ডালহৌসি 1856 সালের 26 জুলাই ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ (Act XV) পাশ করেন। তিনি শুধু আইন করেই ক্ষান্ত হননি, নিজের পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সাথে এক বিধবার বিবাহ দেন এবং নিজের অর্থে প্রায় 60টি বিধবা বিবাহ দেন।
ii. বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ বিরোধিতা: তিনি বাল্যবিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং 1850 সালে ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ নামে গ্রন্থ লেখেন। কুলীন ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি 1871 সালে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা’ গ্রন্থ লেখেন। তাঁর চাপে 1891 সালে ‘Age of Consent Act’ পাশ হয়, যাতে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স 12 বছর করা হয়।
iii. নারী শিক্ষা বিস্তার: তিনি ছিলেন নারী শিক্ষার প্রধান উদ্যোক্তা। 1849 সালে বেথুন স্কুলের সম্পাদক হিসাবে তিনি নারী শিক্ষা প্রসারে কাজ করেন। 1857-58 সালে তিনি দক্ষিণবঙ্গে নিজের অর্থে প্রায় 35টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’র মাধ্যমে তিনি নারী শিক্ষার পক্ষে জনমত গঠন করেন।
iv. শিক্ষা সংস্কার ও বাংলা গদ্য: শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। 1855 সালে ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ লিখে তিনি বাংলা শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেন। ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’ তাঁর লেখা। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে তিনি সেখানে ইংরেজি শিক্ষা চালু করেন, জাতিভেদ প্রথা তুলে দেন। 1872 সালে তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন।
v. মানবতাবাদ: তিনি ছিলেন ‘দয়ার সাগর’। দরিদ্র ছাত্রদের তিনি বিনা বেতনে পড়াতেন, বই দিতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ইংল্যান্ডে অর্থকষ্টে ছিলেন, তখন বিদ্যাসাগর তাঁকে 1500 টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। তিনি ছিলেন একাধারে যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী ও আধুনিক ভারতের রূপকার।
4.2 বাংলায় ওয়াহাবি ও ফরাজী আন্দোলনের বিবরণ দাও।
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের সংস্কার ও কৃষকদের শোষণের বিরুদ্ধে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন গড়ে ওঠে – ওয়াহাবি ও ফরাজী আন্দোলন।
ক) ওয়াহাবি আন্দোলন:
i. সূচনা: আরব দেশে মহম্মদ ইবন আব্দুল ওয়াহাবের আদর্শে ভারতে এই আন্দোলন শুরু করেন সৈয়দ আহমেদ বেরেলভি। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের শুদ্ধিকরণ এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা।
ii. বাংলায় তিতুমীর: বাংলায় এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন মীর নিসার আলি, যিনি তিতুমীর নামে পরিচিত। তিনি 24 পরগনার বারাসাতের নারকেলবেড়িয়া গ্রামে বসবাস করতেন। তিনি কৃষকদের উপর জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন।
iii. বাঁশের কেল্লা: 1831 সালে তিনি নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশ দিয়ে একটি কেল্লা তৈরি করেন। সেখান থেকে তিনি জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। 1831 সালের 19 নভেম্বর ব্রিটিশ সেনা কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে কামান দিয়ে কেল্লা ধ্বংস করে এবং তিতুমীর শহীদ হন। যদিও এটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এটি বাংলার প্রথম কৃষক বিদ্রোহের রূপ নেয়।
খ) ফরাজী আন্দোলন:
i. সূচনা: 1818 সালে ফরিদপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে হাজী শরীয়তউল্লাহ (1781-1840) এই আন্দোলন শুরু করেন। হজ থেকে ফিরে তিনি দেখেন বাংলার মুসলমানরা পীর পূজা, কবর পূজা সহ নানা অনৈসলামিক কুসংস্কারে লিপ্ত। তিনি ইসলামের ‘ফরজ’ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য – যেমন কলমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত কঠোরভাবে পালনের ডাক দেন, তাই এর নাম ফরাজী আন্দোলন।
ii. দুদু মিঞার নেতৃত্ব: তাঁর পুত্র মুহসীনউদ্দিন আহমেদ, যিনি দুদু মিঞা (1819-1862) নামে পরিচিত, এই ধর্মীয় আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী কৃষক আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহের দরিদ্র কৃষকদের সংগঠিত করেন।
iii. কর্মসূচি: তিনি ঘোষণা করেন – “জমির মালিক আল্লাহ, জমিদার নয়”। তিনি কৃষকদের খাজনা বন্ধ করতে বলেন, নিজস্ব পঞ্চায়েত ও আদালত গঠন করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী তৈরি করেন। তিনি জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বহুবার গ্রেপ্তার করে।
দুটি আন্দোলনই ধর্মীয় সংস্কারের মোড়কে বাংলার কৃষক জাগরণের প্রথম পর্ব।
4.3 উনিশ শতকে বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়?
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় শিক্ষা বিস্তার ছিল নবজাগরণের মূল ভিত্তি। সরকারি ও বেসরকারি বহু উদ্যোগে এই শিক্ষা বিস্তার ঘটে।
i. পাশ্চাত্য শিক্ষার সূচনা: 1817 সালে ডেভিড হেয়ার, রাজা রামমোহন রায় ও রাধাকান্ত দেবের উদ্যোগে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। একই বছর হেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। 1835 সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সময় মেকলে মিনিটের সুপারিশে ইংরেজি শিক্ষা সরকারি নীতি হিসাবে গৃহীত হয়। 1835 সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ এবং 1857 সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
ii. সরকারি নীতি – উডের ডেসপ্যাচ: 1854 সালে চার্লস উডের ডেসপ্যাচকে ‘ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয়। এতে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত স্তরভিত্তিক শিক্ষা, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা এবং স্ত্রী শিক্ষার কথা বলা হয়। এর ভিত্তিতেই 1857 সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।
iii. নারী শিক্ষা: 1849 সালে বেথুন সাহেব হিন্দু ফিমেল স্কুল (বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 35টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। মুসলিম নারী শিক্ষায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন 1911 সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
iv. ছাপাখানা ও পাঠ্যপুস্তক: শ্রীরামপুর মিশন প্রেস, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ছাপাখানা বইকে সস্তা ও সহজলভ্য করে। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’, ‘বোধোদয়’, অক্ষয়কুমার দত্তের বিজ্ঞান বিষয়ক বই, মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ শিক্ষা বিস্তারে বিরাট ভূমিকা নেয়। ‘সমাচার দর্পণ’, ‘তত্ত্ববোধিনী’, ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়।
v. জাতীয় শিক্ষা: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় 1906 সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ এবং বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল স্বদেশি ধারায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া। এর ফলে বাংলায় এক আধুনিক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ তৈরি হয়।
Madhyamik History Model Answers-6
4.4 জাতীয়তাবাদ বিকাশে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (1882) উপন্যাসটি বাংলায় তথা ভারতে জাতীয়তাবাদ বিকাশে ‘বাইবেল’ স্বরূপ ছিল।
i. পটভূমি: উপন্যাসটি 1770 সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা। বঙ্কিম দেখান কীভাবে ব্রিটিশ শাসনে বাংলার মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাচ্ছে।
ii. বন্দেমাতরম মন্ত্র: এই উপন্যাসেই বঙ্কিম ‘বন্দেমাতরম’ গানটি রচনা করেন। গানটিতে দেশকে ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম’ রূপে বন্দনা করা হয়েছে। দেশকে মা হিসাবে পূজা করার এই ধারণা ভারতীয়দের মধ্যে এক নতুন দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথ এই গানে সুর দেন এবং এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়।
iii. সন্তান দল ও বিপ্লবী আদর্শ: উপন্যাসে সত্যানন্দের নেতৃত্বে ‘সন্তান দল’ নামে একদল দেশপ্রেমিক যুবক দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। তাদের কঠোর শৃঙ্খলা, গোপন সংগঠন ও আত্মত্যাগের আদর্শ পরবর্তীতে অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী সংগঠনের অনুপ্রেরণা হয়। অরবিন্দ ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্তরা এই উপন্যাসকে তাদের গীতা হিসাবে মানতেন।
iv. জাতীয়তাবাদের ধারণা: বঙ্কিমই প্রথম দেশকে দেবী হিসাবে তুলে ধরেন এবং ধর্মীয় আবেগের সাথে জাতীয়তাবাদকে যুক্ত করেন।
v. ব্রিটিশ প্রতিক্রিয়া: ব্রিটিশ সরকার এই উপন্যাসের বিপজ্জনক প্রভাব বুঝতে পেরে এটিকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করে। তবুও এটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় এবং জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে।
4.5 গান্ধীজীর নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলনের বিবরণ দাও।
উত্তর: 1930 থেকে 1934 সাল পর্যন্ত গান্ধীজীর নেতৃত্বে পরিচালিত আইন অমান্য আন্দোলন ছিল অসহযোগ আন্দোলনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম গণ আন্দোলন।
কারণ: সাইমন কমিশন বয়কট (1928), নেহেরু রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান, 1929 সালে লাহোর কংগ্রেসে পূর্ণ স্বরাজের দাবি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন শুরু হয়।
সূচনা – ডান্ডি মার্চ: 1930 সালের 12 মার্চ গান্ধীজী তাঁর 78 জন অনুগামী নিয়ে সবরমতী আশ্রম থেকে গুজরাটের সমুদ্র উপকূলের ডান্ডি গ্রাম পর্যন্ত 240 মাইল পদযাত্রা করেন। 6 এপ্রিল তিনি সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরি করে ব্রিটিশ লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এই লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমেই আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়।
কর্মসূচি:
i. লবণ আইন, বন আইন ভঙ্গ, খাজনা ও চৌকিদারি কর বন্ধ করা।
ii. বিদেশি বস্ত্র ও মদ দোকানে পিকেটিং, স্কুল-কলেজ ও আদালত বর্জন।
iii. এই আন্দোলনে নারী, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী সকল শ্রেণির মানুষ অংশ নেয়। নারীরা প্রথমবার বড় সংখ্যায় রাস্তায় নামে।
iv. উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খান আবদুল গফফর খানের নেতৃত্বে ‘খুদাই খিদমতগার’ বা লালকোর্তা বাহিনী এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
গুরুত্ব ও ফলাফল:
i. ব্রিটিশ সরকার দমননীতি চালালেও বাধ্য হয়ে 1931 সালের 5 মার্চ গান্ধী-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়।
ii. এই চুক্তির পর গান্ধীজী দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে (1931) যোগ দিতে লন্ডনে যান।
iii. যদিও আন্দোলন তার লক্ষ্যে পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু এটি জাতীয়তাবাদকে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে দেয় এবং ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়িয়ে দেয়।
Madhyamik History Model Answers-6
4.6 বাংলায় দলিত আন্দোলন – বাউরি ও নমঃশূদ্র আন্দোলন।
উত্তর: বাংলায় দলিত বলতে নমঃশূদ্র, বাউরি, বাগদি, মুচি, ডোম প্রভৃতি অন্ত্যজ সম্প্রদায়কে বোঝায়, যারা উচ্চবর্ণের দ্বারা শোষিত ও অস্পৃশ্য হিসাবে বিবেচিত হত।
ক) নমঃশূদ্র আন্দোলন:
i. পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, যশোর, বরিশালে নমঃশূদ্ররা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলিত সম্প্রদায়। তাদের মধ্যে আত্মসম্মান জাগাতে 1812 সালে হরিচাঁদ ঠাকুর (1812-1878) ফরিদপুরের ওড়াকান্দিতে ‘মতুয়া’ ধর্মমত প্রচার করেন। তাঁর মূলমন্ত্র ছিল – ‘হরি বল’, ‘হাতে কাম, মুখে নাম’, ‘জাতিভেদ মানি না’। তিনি পৈতা ধারণ, শিক্ষা ও ঐক্যের ডাক দেন।
ii. তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (1846-1937) এই আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তিনি নমঃশূদ্রদের জন্য বহু স্কুল, পাঠশালা ও ছাত্রাবাস তৈরি করেন। 1932 সালে তিনি ‘মতুয়া মহাসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নমঃশূদ্রদের শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি তোলেন।
iii. পরবর্তীতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল 1940-এর দশকে এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেন এবং ড. বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন ‘তপশিলি ফেডারেশন’-এ যোগ দেন।
খ) বাউরি আন্দোলন:
i. বাউরিরা হল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান ও বীরভূমের একটি বৃহৎ দলিত সম্প্রদায়, যারা মূলত কৃষি শ্রমিক হিসাবে কাজ করত।
ii. 1920-30 এর দশকে বাউরিরা জাতপাতের বিরুদ্ধে, শিক্ষা, জমির অধিকার এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
iii. তারা নমঃশূদ্রদের মতো অতটা সংগঠিত ছিল না, কিন্তু তারাও দলিত চেতনার অংশ হিসাবে নিজেদের মধ্যে সভা-সমিতি ও শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা করে।
এই দুটি আন্দোলনই বাংলায় দলিতদের মধ্যে আত্মসম্মান, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকারবোধ জাগিয়ে তোলে এবং পরবর্তীতে বৃহত্তর দলিত আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
4.7 স্বাধীনতার পর উদ্বাস্তু সমস্যা কীভাবে ভারতের অর্থনীতি ও সমাজে প্রভাব ফেলে?
উত্তর: 1947 সালে দেশভাগের ফলে প্রায় 1 কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে আসে প্রায় 50 লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্তু। এই বিশাল জনস্রোত ভারতের অর্থনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিতে প্রভাব:
i. খাদ্য ও বাসস্থান সংকট: হঠাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের তীব্র সংকট দেখা দেয়। কলকাতার উপর চাপ বাড়ে, বস্তি ও জবরদখল কলোনি গড়ে ওঠে।
ii. সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি: ত্রাণ, পুনর্বাসন, ঋণ ও ক্যাম্প তৈরিতে সরকারকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করে।
iii. শিল্পে সংকট: পাট চাষের জমি পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়, কিন্তু পাটকলগুলি ভারতে থেকে যায়, ফলে পাট শিল্পে কাঁচামালের সংকট দেখা দেয়।
সমাজে প্রভাব:
i. নতুন সংস্কৃতি: পূর্ববঙ্গের ভাষা, রান্না, লোকগান, সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির সাথে মিশে এক নতুন মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দেয়।
ii. রাজনৈতিক প্রভাব: উদ্বাস্তুরা বেঁচে থাকার জন্য সংগঠিত হয় এবং বামপন্থী আন্দোলনে যোগ দেয়। যাদবপুর, বিজয়গড়ের কলোনি আন্দোলন বামপন্থীদের শক্তিশালী করে তোলে।
iii. শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তন: উদ্বাস্তুরা শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিল, ফলে নতুন স্কুল-কলেজ তৈরি হয়। প্রথম দিকে এপার বাংলা ও ওপার বাংলার মধ্যে সামাজিক টানাপোড়েন থাকলেও পরে তারা মিশে যায়।
iv. নগরায়ন: কলকাতা ও তার আশেপাশে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বস্তি সম্প্রসারণ ঘটে। তবুও উদ্বাস্তুরা নিজেদের অদম্য পরিশ্রমে বাংলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।
Madhyamik History Model Answers-6
4.8 স্বাধীনতার পর ভারতে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশের ইতিহাস লেখো।
উত্তর: স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে জাতি গঠনের মূল হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন বড় বাঁধ, কারখানা হল ‘আধুনিক ভারতের তীর্থক্ষেত্র’।
i. পরমাণু শক্তি: 1948 সালে বিজ্ঞানী হোমি জে. ভাবার নেতৃত্বে ‘পরমাণু শক্তি কমিশন’ গঠিত হয়। 1954 সালে ট্রম্বেতে (বর্তমান BARC) ভারতের প্রথম পারমাণবিক চুল্লি ‘অপ্সরা’ চালু হয়।
ii. IIT প্রতিষ্ঠা: কারিগরি শিক্ষার জন্য 1951 সালে খড়গপুরে প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিদেশি সাহায্যে বোম্বে (1958 – সোভিয়েত), কানপুর (1959 – আমেরিকা), মাদ্রাজ (1959 – জার্মানি) ও দিল্লিতে (1961 – ব্রিটেন) IIT গড়ে ওঠে।
iii. CSIR ও গবেষণাগার: 1942 সালে প্রতিষ্ঠিত CSIR-কে স্বাধীনতার পর সম্প্রসারিত করা হয়। এর অধীনে প্রায় 40টি জাতীয় গবেষণাগার – যেমন সেন্ট্রাল ফুয়েল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CFRi., সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CGCRi. গড়ে ওঠে।
iv. মহাকাশ গবেষণা: 1962 সালে বিক্রম সারাভাইয়ের নেতৃত্বে INCOSPAR গঠিত হয়, যা 1969 সালে ISRO-তে পরিণত হয়।
v. বিজ্ঞান নীতি ও প্রতিরক্ষা: 1958 সালে প্রথম বিজ্ঞান নীতি প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়। 1958 সালে প্রতিরক্ষা গবেষণার জন্য DRDO গঠিত হয়।
vi. কৃষি ও চিকিৎসা: কৃষি গবেষণার জন্য ICAR-কে শক্তিশালী করা হয় এবং 1956 সালে চিকিৎসা শিক্ষার জন্য দিল্লিতে AIIMS প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর ফলে ভারত বিজ্ঞান, মহাকাশ, কৃষি ও চিকিৎসায় স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সবুজ বিপ্লব, শ্বেত বিপ্লব ও পারমাণবিক পরীক্ষা সম্ভব হয়।
Madhyamik History Model Answers-6
বিভাগ – ঙ: ব্যাখ্যামূলক (8 নম্বর)
5.1 বাংলা সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র কীভাবে জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহায্য করেছিল?
উত্তর: উনিশ শতকে যখন রাজনৈতিক দল বা জাতীয় কংগ্রেস ছিল না, তখন সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রই ছিল জাতীয়তাবাদের প্রধান বাহন। ব্রিটিশ সরকারের শোষণ ফাঁস করা থেকে শুরু করে জনমত গঠন – সব কাজই করত সংবাদপত্র।
ক) বিকাশের পর্যায়:
i. প্রথম পর্যায় – সূচনা (1818-1830): 1818 সালে শ্রীরামপুর মিশন থেকে ‘দিগদর্শন’ (প্রথম বাংলা সাময়িকী) ও ‘সমাচার দর্পণ’ (প্রথম বাংলা সংবাদপত্র) প্রকাশিত হয়। 1818 সালেই গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ‘বাঙ্গাল গেজেট’ প্রকাশ করেন – এটি প্রথম বাঙালি সম্পাদিত পত্রিকা। এই সময়ে রাজা রামমোহন রায় 1821 সালে ‘সংবাদ কৌমুদী’ ও 1822 সালে ‘মিরাত-উল-আখবার’ প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাগুলি সমাজ সংস্কার – সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে, যা নবজাগরণের ভিত্তি।
ii. মধ্য পর্যায় – সমাজ সংস্কার ও কৃষকের পক্ষে (1831-1868): 1831 সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ ছিল বাংলার প্রথম দৈনিক পত্রিকা, যেখানে সাহিত্য ও সমাজ চেতনা মিশে ছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদের প্রধান মুখপত্র ছিল হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ (1853)। হরিশ মুখার্জি নীল বিদ্রোহে (1859-60) কৃষকদের পক্ষে নির্ভীকভাবে লিখতেন এবং নীলকরদের অত্যাচার ফাঁস করেন। দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের ‘সোমপ্রকাশ’ (1858) বিধবা বিবাহকে সমর্থন করে এবং ব্রিটিশ নীতির সমালোচনা করত বলে সরকার দুবার জরিমানা করে।
iii. জাতীয়তাবাদী পর্যায় (1868-1905): এই পর্যায়ে সংবাদপত্র সরাসরি জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠে।
<span;><span;>- অমৃতবাজার পত্রিকা (1868): শিশির কুমার ঘোষ ও মতিলাল ঘোষ যশোর থেকে প্রকাশ করেন। এটি ব্রিটিশ বিরোধী লেখার জন্য বিখ্যাত ছিল। 1878 সালে ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’ থেকে বাঁচতে রাতারাতি এটি বাংলা থেকে ইংরেজি হয়ে যায়।
<span;><span;>- বঙ্গদর্শন (1872): বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র ও দেশকে মা হিসাবে পূজার ধারণা ছড়িয়ে দেন।
<span;><span;>- সঞ্জীবনী (1883): কৃষ্ণকুমার মিত্রের এই পত্রিকা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বয়কট ও স্বদেশির প্রধান প্রচারক ছিল।
iv. চরমপন্থী ও বিপ্লবী পর্যায় (1905-1914): বঙ্গভঙ্গের পর বিপ্লবী পত্রিকার জন্ম হয় – অরবিন্দ ঘোষের ‘বন্দেমাতরম’ (ইংরেজি), ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের ‘সন্ধ্যা’, ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের ‘যুগান্তর’। যুগান্তর পত্রিকা খোলাখুলিভাবে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিত – “বোমার যুগ এসেছে”। ব্রিটিশ সরকার বহু সম্পাদককে জেলে পাঠায়।
খ) জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভূমিকা:
i. শোষণ ফাঁস: নীলকর, জমিদার, ব্রিটিশের অর্থনৈতিক শোষণ ফাঁস করে মানুষকে সচেতন করা।
ii. জনমত গঠন: রেল, টেলিগ্রাফের আগে সংবাদপত্রই ছিল জাতীয় নেতাদের বক্তব্য গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম।
iii. ঐক্য গঠন: হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, স্বদেশি, বয়কট, জাতীয় শিক্ষার প্রচার করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা।
iv. সাহিত্য ও চেতনা: উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে দেশপ্রেম জাগানো।
সরকারি দমন: ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়ে 1878 সালে লর্ড লিটন ‘দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন’ (Vernacular Press Act) পাশ করে, যাকে ‘মুখ বন্ধ করার আইন’ বলা হত। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা যায়নি। তাই বলা হয়, সংবাদপত্রই ছিল জাতীয়তাবাদের মুখপত্র ও জাতীয় কংগ্রেসের পূর্বসূরি।
Madhyamik History Model Answers-6
5.2 বাংলায় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস – সন্ন্যাসী-ফকির থেকে তেভাগা।
উত্তর: বাংলায় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস প্রায় 200 বছরের। ব্রিটিশ শাসনে জমিদারি, ইজারাদারি, নীলকর, মহাজনি শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকরা বারবার বিদ্রোহ করেছে।
i. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (1763-1800) – প্রথম কৃষক বিদ্রোহ: কোম্পানি 1770 সালের দুর্ভিক্ষের পরও কৃষকদের উপর তীর্থকর, অতিরিক্ত খাজনা চাপায়। উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী (ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী) ও ফকির (মজনু শাহ, চিরাগ আলি) নেতৃত্বে কৃষকরা সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। এটি বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসের পটভূমি। 30 বছর ধরে চলা এই বিদ্রোহ বাংলায় কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ।
ii. রংপুর বিদ্রোহ (1783): ওয়ারেন হেস্টিংসের ইজারাদারি প্রথায় রংপুরের ইজারাদার দেবী সিংহ কৃষকদের উপর অত্যাচার শুরু করেন। নুরুলউদ্দিন নিজেকে নবাব ঘোষণা করে কৃষকদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন। ব্রিটিশ সেনা কামান দিয়ে দমন করে।
iii. চুয়াড় বিদ্রোহ (1798-99): মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-মানভূমে জমিদারদের জমি কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে চুয়াড় উপজাতি দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে।
iv. ওয়াহাবি-ফরাজী আন্দোলন (1831-1847) – ধর্মীয় মোড়কে কৃষক আন্দোলন:
<span;><span;>- ওয়াহাবি: তিতুমীর (মীর নিসার আলি) 24 পরগনার নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা তৈরি করে জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন (1831)।
<span;><span;>- ফরাজী: হাজী শরীয়তউল্লাহ 1818 সালে ফরিদপুরে শুরু করেন, পুত্র দুদু মিঞা “জমির মালিক আল্লাহ” বলে খাজনা বন্ধের ডাক দেন। দুটিই ধর্মীয় সংস্কারের মোড়কে শুরু হলেও প্রকৃতিতে কৃষক আন্দোলন।
v. সাঁওতাল বিদ্রোহ (1855-56): সিধু-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা দিকু (বহিরাগত মহাজন), জমিদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। 10,000 সাঁওতাল নিহত হয়।
vi. নীল বিদ্রোহ (1859-60) – প্রথম সফল আন্দোলন: নদীয়ার গোবিন্দপুরে দিগম্বর-বিষ্ণু বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষকরা “নীল চাষ করব না” বলে বিদ্রোহ করে। হিন্দু প্যাট্রিয়ট, নীলদর্পণ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমর্থন করে। 1860 সালে নীল কমিশন বসে এবং নীল চাষ ঐচ্ছিক হয়। এটি সফল কৃষক-মধ্যবিত্ত ঐক্যের উদাহরণ।
vii. বিংশ শতক – তেভাগা আন্দোলন (1946-47) – বৃহত্তম আন্দোলন: 1940 সালে ফ্লাউড কমিশন ফসলের 2/3 ভাগ (তেভাগা) বর্গাদারের প্রস্তাব দিলে 1946 সালে বঙ্গীয় কিষাণ সভা (কমিউনিস্ট) উত্তরবঙ্গে আন্দোলন শুরু করে। দাবি ছিল – ফসল জোতদারের খামারে নয়, কৃষকের খামারে তুলতে হবে। নেতৃত্বে ছিলেন ইলা মিত্র, রামেন মিত্র, গুরুদাস তালুকদার। নারীরা লাঠি হাতে পাহারা দিত। জমিদার ও পুলিশ নির্মমভাবে দমন করে, ইলা মিত্রকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়।
গুরুত্ব: সন্ন্যাসী-ফকির থেকে তেভাগা পর্যন্ত এই 180 বছরের আন্দোলন কৃষকদের মধ্যে শ্রেণী চেতনা জাগায়, জাতীয় আন্দোলনকে গণ আন্দোলনে পরিণত করে এবং স্বাধীনতার পর 1953 সালে জমিদারি উচ্ছেদ ও 1978 সালে অপারেশন বর্গার ভিত্তি তৈরি করে।
Madhyamik History Model Answers-6
5.3 ঠাকুর পরিবারের সাংস্কৃতিক অবদান আলোচনা করো – রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ।
উত্তর: কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবার ছিল উনিশ-বিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ, জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক সংস্কৃতির কেন্দ্র। এই পরিবার থেকে প্রায় 3 প্রজন্ম ধরে বাংলার সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদে নেতৃত্ব দেওয়া হয়।
ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861-1941) – বিশ্বকবি:
ঠাকুর পরিবারের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র।
i. সাহিত্যে: ‘গোরা’ (1910) উপন্যাসে উদার জাতীয়তাবাদের কথা, ‘ঘরে বাইরে’ (1916) উপন্যাসে স্বদেশি আন্দোলনের সমালোচনা, ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য 1913 সালে এশিয়ার প্রথম নোবেল পুরস্কার। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেন।
ii. সংগীতে: 2000-এর বেশি গান – রবীন্দ্রসংগীত। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ‘আমার সোনার বাংলা’ (বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত), ‘জনগণমন অধিনায়ক’ (ভারতের জাতীয় সংগীত) রচনা করেন। তাঁর গান ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাণ।
iii. শিক্ষায়: 1901 সালে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন – প্রকৃতির মাঝে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষা। 1921 সালে ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটে।
iv. জাতীয়তাবাদে: 1905 সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রাখি বন্ধন উৎসব করেন, 1919 সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশদের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন। হিন্দু মেলা, বিচিত্রা ক্লাবে সক্রিয় ছিলেন।
খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1871-1951) – ভারতীয় চিত্রকলার জনক:
রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র।
i. ভারতমাতা চিত্র (1905): বঙ্গভঙ্গের পটভূমিতে তিনি ‘ভারতমাতা’ (1905) নামে এক গেরুয়া বসনা, সন্ন্যাসিনী রূপে ভারতমাতার ছবি আঁকেন, যা জাতীয়তাবাদী চিত্রকলার জন্ম দেয়। এই ছবি দেখে বিপ্লবীরা অনুপ্রাণিত হত।
ii. বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট: ই. বি. হ্যাভেলের সাথে তিনি ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পাশ্চাত্য বাস্তববাদী চিত্রকলার বদলে ভারতীয় মুঘল, রাজপুত, অজন্তা রীতিতে ছবি আঁকার ডাক দেন। তাঁর বিখ্যাত ছবি – ‘শাহজাহানের মৃত্যু’, ‘বুদ্ধ ও সুজাতা’, ‘তিসা’, ‘ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু’।
iii. শিশু সাহিত্য: তিনি ‘বুড়ো আংলা’, ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘শকুন্তলা’র মতো অসাধারণ শিশু সাহিত্য লেখেন।
গ) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (1867-1938) – আধুনিক চিত্রকলার প্রবর্তক:
অবনীন্দ্রনাথের দাদা।
i. আধুনিকতা ও কিউবিজম: তিনি ভারতে প্রথম কিউবিজম, আধুনিক ইউরোপীয় রীতিতে ছবি আঁকেন। তিনি শুধু ইতিহাস নয়, বর্তমান সমাজকে আঁকেন।
ii. ব্যঙ্গচিত্র: তাঁর ‘অদ্ভুত লোক’ ও ‘চৈতন্য’ সিরিজে তিনি বাঙালি বাবু, সাহেবিয়ানা ও সমাজের ভণ্ডামির ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন, যা অত্যন্ত আধুনিক।
iii. মঞ্চ ও নাটক: হিন্দু মেলা, বিচিত্রা ক্লাবে তিনি নাটক, মঞ্চসজ্জা, আলপনা, পোশাক পরিকল্পনায় নতুনত্ব আনেন।
উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য ও সংগীতে, অবনীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী চিত্রকলায় এবং গগনেন্দ্রনাথ আধুনিক চিত্রকলায় – তিন ভাই মিলে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িকে বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানীতে পরিণত করেন এবং বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেন।
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.