NIRYAS.IN

শিক্ষাদান বাগানের মালির মতো

NIRYAS.IN

শিক্ষাদান বাগানের মালির মতো

মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রস্তুতি

Madhyamik History Model Answers-8/2

Madhyamik History Model Answers-8

মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ? ইতিহাস বিষয়ে 90-এ 90 পাওয়ার স্বপ্ন দেখছ? তাহলে তোমার এই প্রস্তুতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে আমরা নিয়ে এসেছি মাধ্যমিক (ইতিহাস) (Madhyamik History Model Answers-8) (উত্তরসহ)।নতুন ও আপডেটেড সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি এই মডেল প্রশ্নপত্রটিতে রয়েছে বিভাগ – ক: 20 নম্বরের 20টি MCQ (ব্যাখ্যা সহ), বিভাগ – খ: 16 নম্বরের 16টি অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (1 নম্বরের), বিভাগ – গ: 22 নম্বরের 11টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (2 নম্বরের) এবং বিভাগ – ঘ: 24 নম্বরের 6টি বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন (4 নম্বরের) ও বিভাগ – ঙ: 8 নম্বরের 1টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন (8 নম্বরের) সহ প্রতিটি বিভাগের নির্ভুল ও সম্পূর্ণ সমাধান।। প্রতিটি উত্তরের সাথে উৎস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই মূল পাঠ্যবইয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে।


➣ Join : Our Telegram Channel

➣ Join : Our Whats App Group


Madhyamik History Model Answers-8

Madhyamik History Model Answers
Madhyamik History Model Answers

ইতিহাস(History)

(Part- 2)

⟽ Previous Part

বিভাগ – ঘ: বিশ্লেষণধর্মী

4.1 উনিশ শতকে বাংলায় সমাজ সংস্কারে ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: বাংলার নবজাগরণে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংগঠিত উদ্যোগ ছিল ব্রাহ্মসমাজের। 1828 সালের 20 আগস্ট রাজা রামমোহন রায় ‘ব্রাহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা 1830 সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে পরিচিত হয়। পরে কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী একে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেন।
i. ধর্মীয় সংস্কার: ব্রাহ্মসমাজের মূল ভিত্তি ছিল একেশ্বরবাদ। তারা বহু-ঈশ্বরবাদ, পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, কুসংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করে। তারা প্রচার করে – ঈশ্বর এক ও নিরাকার, সকল মানুষ সমান, বেদ-উপনিষদই প্রকৃত ধর্মগ্রন্থ। এর মাধ্যমে তারা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি দূর করতে চেয়েছিল।
ii. সামাজিক সংস্কার: ব্রাহ্মসমাজ সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা, জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। রামমোহন সতীদাহ নিবারণে (1829) প্রধান ভূমিকা নেন। ব্রাহ্মরা বিধবা বিবাহ, আন্তঃজাতি বিবাহ ও আন্তঃধর্ম বিবাহকে সমর্থন করে। 1872 সালে কেশবচন্দ্র সেনের উদ্যোগে ‘সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট’ বা ‘ব্রাহ্ম বিবাহ আইন’ পাশ হয়, যাতে বিধবা বিবাহ ও আন্তঃজাতি বিবাহ বৈধ হয়।
iii. নারী শিক্ষা ও মুক্তি: ব্রাহ্মসমাজ নারী শিক্ষার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল। তারা বেথুন স্কুলকে সাহায্য করে, নিজেরা ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে। তারা পর্দা প্রথার বিরোধিতা করে নারীদের বাইরের জগতে আনে। ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ (1843) ও ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’র মাধ্যমে তারা সমাজ সংস্কারের কথা প্রচার করে।
iv. যুক্তিবাদ ও জাতীয়তাবাদ: ব্রাহ্মসমাজ যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা শেখায়, যা পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরি করে।
v. বিভাজন ও সীমাবদ্ধতা: যদিও আদি ব্রাহ্মসমাজ (দেবেন্দ্রনাথ), ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ (কেশব) ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ (শিবনাথ শাস্ত্রী) – এই তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় সংগঠন দুর্বল হয়, তবুও ব্রাহ্মসমাজ বাংলার নবজাগরণের নেতৃত্ব দেয়। তবে এর প্রভাব মূলত কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমিত ছিল।

Madhyamik History Model Answers-8

4.2 বাংলায় নীল বিদ্রোহের বিবরণ দাও – কারণ, প্রকৃতি, গুরুত্ব।
উত্তর: 1859-60 সালের নীল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনে বাংলার প্রথম সফল কৃষক আন্দোলন।

কারণ:
i. শোষণমূলক ব্যবস্থা: নীলকর সাহেবরা কৃষকদের ‘দাদন’ নামে অগ্রিম টাকা দিয়ে মাত্র 2 টাকা বিঘা দরে নীল চাষে বাধ্য করত। নীল চাষে জমির উর্বরতা নষ্ট হত, ধান চাষ হত না। কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হত।
ii. অত্যাচার: চাষে অস্বীকার করলে কৃষকদের জমি কেড়ে নেওয়া, বেশি দামে বীজ বিক্রি, মারধর, জেল, নারী নির্যাতন করা হত।
iii. সরকারি ঘোষণা: 1859 সালে সরকার ঘোষণা করে নীল চাষ ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়। এই ঘোষণাই কৃষকদের সাহস জোগায়।

ঘটনা: 1859 সালের সেপ্টেম্বরে নদীয়া জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণু বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষকরা ঘোষণা করে – “নীল চাষ করব না”। তারা লাঠি, সড়কি নিয়ে নীলকুঠি আক্রমণ করে। দ্রুত এই বিদ্রোহ নদীয়া, পাবনা, খুলনা, মুর্শিদাবাদ, যশোরে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকরা জমিদারদেরও বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় যারা নীলকরদের সমর্থন করত।

প্রকৃতি:
i. এটি ছিল কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত, অহিংস ও সংগঠিত আন্দোলন। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল কৃষক একজোট হয়েছিল।
ii. এটি ছিল মধ্যবিত্ত ও কৃষকের ঐক্যের অনন্য উদাহরণ। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত – হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায়, দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ নাটকে (1860) এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ এই আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন করেন।

গুরুত্ব:
i. সরকার 1860 সালে নীল কমিশন বসাতে বাধ্য হয়। কমিশন রিপোর্টে বলে নীল চাষ লাভজনক নয় এবং কৃষকদের জোর করা যাবে না। এর ফলে বাংলায় নীল চাষ বন্ধ হয়ে যায়, নীলকররা বিহারে চলে যায়।
ii. এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনে কৃষকদের প্রথম জয়, যা পরবর্তীতে পাবনা বিদ্রোহ (1873), চম্পারণ সত্যাগ্রহের অনুপ্রেরণা হয়।
iii. এটি প্রমাণ করে সংগঠিত প্রতিরোধে ব্রিটিশ শোষণকে পরাজিত করা সম্ভব।

4.3 বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য, পঞ্চানন কর্মকার ও উপেন্দ্রকিশোরের অবদান লেখো।
উত্তর: বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে তিনজন পথিকৃৎ হলেন পঞ্চানন কর্মকার, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

ক) পঞ্চানন কর্মকার (মৃত্যু 1804):
i. তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম হরফ শিল্পী। তিনি জাতিতে স্বর্ণকার ছিলেন। চার্লস উইলকিন্সের তত্ত্বাবধানে 1778 সালে তিনি প্রথম বাংলা হরফ তৈরি করেন, যা দিয়ে হ্যালহেডের ‘বাংলা ব্যাকরণ’ ছাপা হয়।
ii. পরে তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে উইলিয়াম কেরির সহকারী হিসাবে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, মারাঠি সহ 14টি ভাষার হরফ তৈরি করেন।
iii. তাঁকে ‘বাংলা মুদ্রণের কারিগরি জনক’ বলা হয়, কারণ হরফ ছাড়া ছাপাখানা অসম্ভব ছিল।

খ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য (মৃত্যু 1831):
i. তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি ছাপাখানা মালিক ও প্রকাশক। তাই তাঁকে ‘বাংলা ছাপাখানার জনক’ বলা হয়।
ii. 1818 সালে তিনি কলকাতায় ‘ফেরিস অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে 1818 সালে তিনি ‘বাঙ্গাল গেজেট’ প্রকাশ করেন, যা ছিল প্রথম বাংলা সংবাদপত্র।
iii. তিনি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’, ‘চণ্ডীমঙ্গল’ সস্তায় ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেন এবং গণশিক্ষার ভিত্তি গড়ে দেন।

গ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (1863-1915):
i. তিনি মুদ্রণ শিল্পে আধুনিকতার জনক। 1895 সালে তিনি ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ii. তিনি ভারতে প্রথম হাফটোন ব্লক, রঙিন ছাপা ও ডায়োটাইপ প্রযুক্তি নিয়ে আসেন। আগে ছবি ছাপা কঠিন ছিল, তিনি তা সহজ করেন।
iii. 1913 সালে তিনি শিশুদের জন্য ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন, যেখানে ছবি সহ গল্প ছাপা হত। তাঁর ছাপাখানা থেকেই রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়ের বই ছাপা হয়।
তিনজনের হাত ধরেই বাংলার মুদ্রণ শিল্প হরফ তৈরি থেকে আধুনিক রঙিন ছাপা পর্যন্ত বিবর্তিত হয়।

Madhyamik History Model Answers-8

4.4 শিক্ষা বিস্তারে হিন্দু কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা লেখো।
উত্তর: বাংলায় আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে দুটি প্রতিষ্ঠান যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে – হিন্দু কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

ক) হিন্দু কলেজ (1817):
i. প্রতিষ্ঠা: 1817 সালের 20 জানুয়ারি ডেভিড হেয়ার, রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষা ছড়ানো।
ii. নবজাগরণের কেন্দ্র: এখানে হেনরি ডিরোজিওর মতো যুক্তিবাদী শিক্ষক পড়াতেন। তাঁর হাত ধরেই ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী তৈরি হয়। এই কলেজ থেকেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রাধানাথ শিকদারের মতো মনীষীরা বের হন।
iii. গুরুত্ব: এটি ছিল বাংলার নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র। 1855 সালে এটি সরকারি কলেজ হিসাবে ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ’ নামে পরিচিত হয়, বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়।

খ) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (1857):
i. প্রতিষ্ঠা: 1854 সালের উডের ডেসপ্যাচের সুপারিশ অনুযায়ী 1857 সালের 24 জানুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়।
ii. প্রাথমিক রূপ: প্রথমে এটি ছিল শুধু পরীক্ষা গ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়। এর অধীনে প্রথমে ছিল হিন্দু কলেজ, হুগলি কলেজ, ঢাকা কলেজ ও কৃষ্ণনগর কলেজ।
iii. আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অবদান: 1906 সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় উপাচার্য হয়ে একে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেন। তিনি স্নাতকোত্তর পড়ানো শুরু করেন, 1914 সালে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার ঘটান।
iv. গুরুত্ব: এই বিশ্ববিদ্যালয় সারা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসামে উচ্চ শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়। এখান থেকেই জাতীয়তাবাদী নেতা, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক তৈরি হয়। এটি বাংলায় আধুনিক উচ্চ শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দেয়।

4.5 অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি ও কর্মসূচি আলোচনা করো।
উত্তর: 1920-22 সালের অসহযোগ আন্দোলন ছিল গান্ধীজীর নেতৃত্বে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন।

পটভূমি:
i. রাওলাট আইন (1919): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার রাওলাট আইন পাশ করে, যাতে বিনা বিচারে যে কাউকে গ্রেপ্তার করা যেত। একে ‘কালো আইন’ বলা হত।
ii. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: 1919 সালের 13 এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালানো হয়, প্রায় 400 মানুষ নিহত হয়। এই ঘটনা সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
iii. খিলাফত আন্দোলন: তুরস্কের খলিফার পদ বিলুপ্ত হলে ভারতীয় মুসলিমরা খিলাফত আন্দোলন শুরু করে। গান্ধীজী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন।
iv. এই পরিস্থিতিতে 1920 সালে কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে গান্ধীজীর অসহযোগ প্রস্তাব গৃহীত হয়।

কর্মসূচি:
i. বর্জনমূলক: সরকারি স্কুল-কলেজ, আদালত, আইনসভা, সরকারি অফিস ও বিদেশি পণ্য বর্জন। ছাত্ররা স্কুল ছেড়ে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, জামিয়া মিলিয়া, কাশী বিদ্যাপীঠের মতো জাতীয় বিদ্যালয়ে যোগ দেয়। বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে খাদি ব্যবহার শুরু হয়।
ii. গঠনমূলক: চরকা কাটা, খাদি পরা, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং তিলক স্বরাজ তহবিলে 1 কোটি টাকা তোলা।
iii. সর্বাত্মক অংশগ্রহণ: কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী, ব্যবসায়ী সকলেই অংশ নেয়। 1921 সালে প্রায় 30 হাজার মানুষ জেলে যায়।

1922 সালে চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধীজী আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও, এটি কংগ্রেসকে জনগণের দলে পরিণত করে এবং জাতীয়তাবাদকে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেয়।

Madhyamik History Model Answers-8

4.6 বাংলায় দলিত আন্দোলনের পটভূমি ও মতুয়া আন্দোলন আলোচনা করো।
উত্তর: বাংলায় দলিত বলতে নমঃশূদ্র, বাউরি, বাগদি, মুচি, ডোম, হাড়ি প্রভৃতি অন্ত্যজ সম্প্রদায়কে বোঝায়।

পটভূমি: বর্ণবাদী হিন্দু সমাজে এই সম্প্রদায়গুলিকে অস্পৃশ্য হিসাবে দেখা হত। তাদের মন্দিরে প্রবেশ, পুকুরের জল ব্যবহার, শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণে তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষায় পিছিয়ে ছিল। উনিশ শতকে নবজাগরণ যখন উচ্চবর্ণের মধ্যে সীমিত ছিল, তখন এই দলিত সমাজ নিজেদের আত্মসম্মানের জন্য আন্দোলন শুরু করে।

মতুয়া আন্দোলন:
i. সূচনা ও দর্শন: ফরিদপুর জেলার ওড়াকান্দি গ্রামে হরিচাঁদ ঠাকুর (1812-1878) মতুয়া ধর্মমত প্রচার করেন। মতুয়া মানে মাতোয়ারা – হরিনামে মাতোয়ারা। তিনি ছিলেন নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের। তাঁর মূল বাণী ছিল – ‘হাতে কাম মুখে নাম’, ‘জাতিভেদ মানি না’, ‘শিক্ষা নাও, সংগঠিত হও’। তিনি পৈতা ধারণ ও শিক্ষার ডাক দেন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী আচারের বিরোধিতা করেন।

ii. গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদান: তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (1846-1937) এই ধর্মীয় আন্দোলনকে সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
– তিনি নমঃশূদ্রদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বহু স্কুল, পাঠশালা ও ছাত্রাবাস স্থাপন করেন।
– 1932 সালে তিনি ‘মতুয়া মহাসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
– 1911 সালে তিনি প্রথম নমঃশূদ্র সম্মেলন করেন এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি তোলেন।

iii. রাজনৈতিক রূপ: 1940-এর দশকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেন এবং ড. বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন ‘তপশিলি ফেডারেশন’-এ যোগ দেন। তিনি স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী হন, পরে ভারতে ফিরে আসেন।

মতুয়া আন্দোলন বাংলার দলিতদের মধ্যে আত্মসম্মান, শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলে এবং ভারতের বৃহত্তর দলিত আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে।

4.7 দেশভাগজনিত উদ্বাস্তু সমস্যা ও তার প্রভাব আলোচনা করো।
উত্তর: 1947 সালে দেশভাগের ফলে প্রায় 1 কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। পাঞ্জাবে জনসংখ্যা বিনিময় হলেও বাংলায় তা হয়নি।

সমস্যার স্বরূপ:
i. পাঞ্জাবে 50 লক্ষ শিখ-হিন্দু ভারতে আসে এবং মুসলিমরা পাকিস্তানে যায় – সম্পূর্ণ বিনিময় হয়। কিন্তু বাংলায় শুধু হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসে, মুসলিমরা যায় না। ফলে পশ্চিমবঙ্গে 50 লক্ষ উদ্বাস্তুর চাপ পড়ে এবং এই আগমন 1971 সাল পর্যন্ত চলতে থাকে।
ii. শিয়ালদহ স্টেশন, কলকাতার ফুটপাত, মাঠ, বস্তিতে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়। খাদ্য, বাসস্থান, চাকরির তীব্র সংকট দেখা দেয়।
iii. উদ্বাস্তুরা নিজেরাই ফাঁকা জমি দখল করে যাদবপুর, বিজয়গড়, নেতাজিনগর, আজাদগড়ের মতো প্রায় 150টি জবরদখল কলোনি গড়ে তোলে।

প্রভাব:
i. অর্থনৈতিক প্রভাব: পাট শিল্পে সংকট দেখা দেয়, কারণ পাট চাষের জমি পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়, কিন্তু পাটকলগুলি ভারতে থেকে যায়। খাদ্য সংকট, বেকারত্ব ও সরকারের উপর আর্থিক চাপ বাড়ে।
ii. সামাজিক প্রভাব: পূর্ববঙ্গের ভাষা (বাঙাল ভাষা), রান্না, লোকগান, সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গে আসে এবং এক নতুন মিশ্র সংস্কৃতি তৈরি হয়।
iii. রাজনৈতিক প্রভাব: উদ্বাস্তুরা বেঁচে থাকার জন্য সংগঠিত হয় এবং বামপন্থী আন্দোলনে যোগ দেয়। কলোনি আন্দোলন, উদ্বাস্তু আন্দোলন সিপিআই ও পরে সিপিআই(এম)-কে শক্তিশালী করে। উদ্বাস্তু ভোট ব্যাংক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
iv. সাংস্কৃতিক প্রভাব: উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে নতুন সাহিত্য, গান, নাটক তৈরি হয় – যেমন বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’, নারায়ণ সান্যালের ‘বকুলতলা পি.এল. ক্যাম্প’।

উদ্বাস্তুরা নিজেদের অদম্য পরিশ্রমে নতুন জীবন গড়ে তোলে এবং বাংলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।

Madhyamik History Model Answers-8

4.8 স্বাধীনতার পর ভারতে কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে কী কী সংস্কার হয়?
উত্তর: স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী নেহেরু মিশ্র অর্থনীতি ও পরিকল্পিত উন্নয়নের পথ নেন।

ক) কৃষি ক্ষেত্রে সংস্কার:
i. জমিদারি উচ্ছেদ: 1950-54 সালে বিভিন্ন রাজ্যে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাশ হয়। জমিদারি প্রথা বাতিল করে জমি কৃষকের হাতে দেওয়া হয়।
ii. ভূমি সংস্কার: জমির ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ (সিলিং), বর্গাদারি আইন (1950) পাশ হয়। পশ্চিমবঙ্গে 1978 সালে ‘অপারেশন বর্গা’র মাধ্যমে বর্গাদারদের অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়।
iii. সবুজ বিপ্লব: 1960-এর দশকে কৃষি বিজ্ঞানী এম. এস. স্বামীনাথনের নেতৃত্বে সবুজ বিপ্লব শুরু হয়। উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, সেচের মাধ্যমে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে গম ও ধান উৎপাদন 3 গুণ বেড়ে যায়। ভারত খাদ্যে স্বনির্ভর হয়।
iv. সমবায় ও ঋণ: কৃষি ঋণ, সমবায় সমিতি, ICAR-এর মাধ্যমে কৃষি গবেষণা বাড়ানো হয়।

খ) শিল্প ক্ষেত্রে সংস্কার:
i. মিশ্র অর্থনীতি ও শিল্পনীতি: 1956 সালের শিল্পনীতিতে মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়। ভারী ও মৌলিক শিল্প সরকারের হাতে এবং হালকা শিল্প বেসরকারি হাতে রাখা হয়।
ii. পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও ভারী শিল্প: দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (1956-61) প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের মডেলে ভারী শিল্পের উপর জোর দেওয়া হয়। ভিলাই (সোভিয়েত সাহায্যে), দুর্গাপুর (ব্রিটিশ সাহায্যে), রাউরকেলা (জার্মান সাহায্যে) ইস্পাত কারখানা, BHEL, HAL-এর মতো ভারী কারখানা গড়ে ওঠে।
iii. ব্যাংক জাতীয়করণ: 1969 সালে 14টি বেসরকারি ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়, যাতে কৃষি ও শিল্পে সহজে ঋণ দেওয়া যায়।
iv. ক্ষুদ্র শিল্প: খাদি, কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হয়।

এই সংস্কারগুলির ফলে ভারত কৃষি ও শিল্পে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যায়, যদিও বৈষম্য ও আঞ্চলিক অসমতা থেকেই যায়।

Madhyamik History Model Answers-8

বিভাগ – ঙ: ব্যাখ্যামূলক (8 নম্বর)

5.1 উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ আলোচনা করো।
উত্তর: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ মানে শুধু সাহিত্য ও ধর্ম সংস্কার নয়, এর প্রধান ভিত্তি ছিল যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান শিক্ষা। রাজা রামমোহন রায়ই প্রথম বলেন, ভারতের উন্নতির জন্য বেদ-বেদান্ত নয়, আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষা প্রয়োজন।

i. পাশ্চাত্য শিক্ষার সূচনা – সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ:
– হিন্দু কলেজ (1817): ডেভিড হেয়ার, রাধাকান্ত দেব, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়, যেখানে ইংরেজি, আধুনিক বিজ্ঞান, অঙ্ক পড়ানো হত। ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল ছাত্ররা এখানেই বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়ায়।
– কলকাতা মেডিকেল কলেজ (1835): এশিয়ার প্রথম মেডিকেল কলেজ, যেখানে মধুসূদন গুপ্ত প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেন এবং বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা শুরু হয়।
– শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (1842): ভারতের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হত।
রামমোহন রায় লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখে সংস্কৃত কলেজের বদলে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার দাবি জানান।

ii. সরকারি উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা:
ব্রিটিশ সরকার বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেরানি তৈরি করা, ইঞ্জিনিয়ার নয়। কারণ ভারতীয়রা কারিগরি শিক্ষা শিখলে ব্রিটিশ শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতা করবে। তাই 1854 সালে উডের ডেসপ্যাচ (শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা) তে সাহিত্য, আইন, দর্শনের কথা বলা হয়, কিন্তু কারিগরি শিক্ষার কথা প্রায় বলা হয়নি। এর ফলে সরকারি উদ্যোগে বিজ্ঞান শিক্ষা খুব ধীরে এগোয়।

iii. জাতীয়তাবাদী উদ্যোগ – স্বদেশি বিজ্ঞান:
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের (1905) সময় বাঙালিরা বুঝতে পারে স্বদেশি শিল্পের জন্য নিজেদের ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন।
– জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও BTI (1906): 1906 সালের 1 মার্চ সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, তারকনাথ পালিত, রাসবিহারী ঘোষের উদ্যোগে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠিত হয়। এর অধীনে 1906 সালের 25 জুলাই ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (BTi. প্রতিষ্ঠা হয়। তারকনাথ পালিত 15 লক্ষ টাকা দান করেন। উদ্দেশ্য – ব্রিটিশ শিক্ষা বর্জন করে জাতীয়তাবাদী, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া। 1910 সালে BTI যাদবপুরে চলে যায় এবং 1928 সালে ‘কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ হয়, যা স্বাধীনতার পর 1955 সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় – ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়।

iv. বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠানের অবদান:
– ড. মহেন্দ্রলাল সরকার ও IACS (1876): 1876 সালের 29 জুলাই কলকাতায় তিনি ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতীয়দের অর্থে, ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত বিজ্ঞান গবেষণার প্রথম প্রতিষ্ঠান। উদ্দেশ্য – বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করা। এখানেই 1928 সালে সি. ভি. রমন ‘রমন প্রভাব’ আবিষ্কার করে 1930 সালে নোবেল পান – বিজ্ঞানে ভারতের প্রথম নোবেল।
– রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ (1914): আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের দানে 1914 সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজ্ঞান কলেজ’ বা ‘রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ’ প্রতিষ্ঠা হয়। এখানে জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা পড়াতেন। এটি ছিল ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার প্রধান কেন্দ্র।
– বসু বিজ্ঞান মন্দির (1917): আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু 1917 সালে নিজের বাড়িতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন – উদ্ভিদের প্রাণ ও বেতার নিয়ে গবেষণা।
– বেঙ্গল কেমিক্যাল (1892): আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় 1892 সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠা করে স্বদেশি শিল্প ও ফলিত রসায়ন শিক্ষার ভিত্তি গড়েন।

গুরুত্ব: বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা বাংলায় কুসংস্কার দূর করে যুক্তিবাদ, স্বদেশি শিল্পের চেতনা ও জাতীয়তাবাদ জাগায় এবং স্বাধীন ভারতের ISRO, IIT, CSIR-এর ভিত্তি তৈরি করে।

Madhyamik History Model Answers-8

5.2 বাংলায় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস – রংপুর থেকে তেভাগা পর্যন্ত।
উত্তর: বাংলায় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনের সমান পুরনো। 1783 সালের রংপুর থেকে 1946 সালের তেভাগা পর্যন্ত প্রায় 160 বছর ধরে বাংলার কৃষকরা জমিদার, ইজারাদার, নীলকর ও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
i. রংপুর বিদ্রোহ (1783) – কোম্পানি আমলে প্রথম: ওয়ারেন হেস্টিংস 1773 সালে জমিদারি নিলামে ইজারা দেওয়ার প্রথা চালু করেন। রংপুরের ইজারাদার ছিলেন দেবী সিংহ, যিনি কৃষকদের উপর অতিরিক্ত কর চাপান। 1783 সালের জানুয়ারিতে নুরুলউদ্দিনের নেতৃত্বে কৃষকরা বিদ্রোহ করে, কোম্পানির অফিস ও কাছারি লুট করে। ব্রিটিশ সেনা দমন করলেও কর কমাতে বাধ্য হয়। এটি ছিল বাংলায় প্রথম সংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ।
ii. সন্ন্যাসী-ফকির (1763-1800) ও চুয়াড় বিদ্রোহ (1798-99): সন্ন্যাসী-ফকিররা (ভবানী পাঠক, মজনু শাহ) কোম্পানির তীর্থকর ও জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে 30 বছর ধরে লড়াই করে। বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ এর পটভূমি। চুয়াড়রা (দুর্জন সিংহ) জঙ্গলমহল মেদিনীপুর-বাঁকুড়ায় জমিদারি নিলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
iii. ওয়াহাবি-ফরাজী (1831-1847) – ধর্মীয় মোড়কে কৃষক আন্দোলন:
– তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (1831) – 24 পরগনার বারাসাতের নারকেলবেড়িয়ায় তিতুমীর বাঁশের কেল্লা তৈরি করে জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
– দুদু মিঞার ফরাজী আন্দোলন (1847) – হাজী শরীয়তউল্লাহর পুত্র দুদু মিঞা ঘোষণা করেন “জমির মালিক আল্লাহ, জমিদার নয়” এবং খাজনা বন্ধের ডাক দেন। দুটিই ধর্মীয় সংস্কার হিসাবে শুরু হলেও প্রকৃতিতে কৃষক আন্দোলন ছিল।
iv. সাঁওতাল বিদ্রোহ (1855-56): সিধু-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা দিকু (মহাজন), জমিদারের বিরুদ্ধে জমি রক্ষার জন্য বিদ্রোহ করে। 10,000 সাঁওতাল নিহত হয়।
v. নীল বিদ্রোহ (1859-60) – প্রথম সফল আন্দোলন: নদীয়ার গোবিন্দপুরে দিগম্বর-বিষ্ণু বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষকরা ঘোষণা করে “নীল চাষ করব না”। নীলকররা ‘দাদন’ দিয়ে 2 টাকা বিঘা দরে নীল চাষে বাধ্য করত। হিন্দু প্যাট্রিয়ট (হরিশ মুখার্জি), নীলদর্পণ (দীনবন্ধু মিত্র) এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। 1860 সালে নীল কমিশন নীল চাষ ঐচ্ছিক করে – বাংলায় নীল চাষ বন্ধ হয়। এটি ছিল প্রথম সফল কৃষক-মধ্যবিত্ত ঐক্যের আন্দোলন।
vi. বিংশ শতক – তেভাগা আন্দোলন (1946-47) – বৃহত্তম আন্দোলন: 1940 সালে ফ্লাউড কমিশন সুপারিশ করে বর্গাদারদের ফসলের 2/3 ভাগ (তেভাগা) দেওয়া উচিত, আধি নয়। 1946 সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভা (কমিউনিস্ট) উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, ময়মনসিংহে আন্দোলন শুরু করে। স্লোগান ছিল – ‘আধি নয় তেভাগা চাই, নিজ খামারে ধান তোলো’। নেতৃত্বে ছিলেন কম্পরাম সিং, ভবানী সেন, ইলা মিত্র, রামেন মিত্র। নারীরা লাঠি হাতে ধান কাটা পাহারা দিত। জমিদার ও পুলিশ নির্মমভাবে দমন করে, ইলা মিত্রকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। দেশভাগের কারণে আন্দোলন দুর্বল হয়, কিন্তু এর চাপে 1950 সালে বর্গাদারি আইন পাশ হয়, যা পরে 1978 সালে বামফ্রন্ট সরকারের ‘অপারেশন বর্গা’র ভিত্তি হয়।

উপসংহার: রংপুর থেকে তেভাগা পর্যন্ত এই দীর্ঘ আন্দোলন বাংলার কৃষকদের মধ্যে শ্রেণী চেতনা জাগায়, জাতীয় আন্দোলনকে গণ আন্দোলনে পরিণত করে এবং স্বাধীনতার পর ভূমি সংস্কারের পথ প্রশস্ত করে।

Madhyamik History Model Answers-8

5.3 স্বাধীন ভারতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন আন্দোলন ও তার ফলাফল আলোচনা করো।
উত্তর: স্বাধীনতার সময় ভারতের মানচিত্র ছিল ব্রিটিশদের তৈরি প্রদেশ অনুযায়ী – যেমন বোম্বে প্রেসিডেন্সিতে মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড় সবাই ছিল। কিন্তু কংগ্রেস 1920 সালে নাগপুর অধিবেশনে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই দাবি আরও জোরালো হয়।

পটভূমি:
i. স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ও সর্দার প্যাটেল ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের বিরোধী ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন এতে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হবে, বিচ্ছিন্নতাবাদ বাড়বে। তাই 1948 সালে ধার কমিশন ও 1948 সালে JVP কমিটি (জওহরলাল, বল্লভভাই, পট্টভি) ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের বিরোধিতা করে।
ii. কিন্তু দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে তেলেগু ভাষীরা পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। কারণ মাদ্রাজে তামিলদের আধিপত্য ছিল।

আন্দোলন: i. পট্টি শ্রীরামুলুর অনশন ও মৃত্যু (1952): এই আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হল গান্ধীবাদী নেতা পট্টি শ্রীরামুলুর আমরণ অনশন। 1952 সালের 19 অক্টোবর থেকে তিনি মাদ্রাজে অন্ধ্রপ্রদেশের দাবিতে অনশন শুরু করেন। নেহেরু গুরুত্ব না দেওয়ায় 58 দিন অনশনের পর 1952 সালের 15 ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
ii. সারা ভারতে আগুন: তাঁর মৃত্যুর পর সারা অন্ধ্রে হিংসাত্মক বিক্ষোভ, রেল অবরোধ, অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামলাতে নেহেরু 1953 সালের 1 অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের ঘোষণা করেন। এটি ছিল স্বাধীন ভারতে প্রথম ভাষা ভিত্তিক রাজ্য, রাজধানী হয় কুর্নুল।
iii. রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (1953): অন্ধ্রের পর সারা ভারতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্যের দাবি ওঠে – মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পাঞ্জাব, কেরালা। বাধ্য হয়ে সরকার 1953 সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ গঠন করে। সদস্য ছিলেন হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কে. এম. পানিক্কর।
iv. কমিশনের রিপোর্ট (1955): কমিশন 1955 সালে রিপোর্ট দেয় – ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন করা যায়, তবে তা জাতীয় ঐক্য, প্রশাসনিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক দিক দেখে করতে হবে। শুধু ভাষা নয়, অন্য বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ফলাফল:
i. 1956 সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইন: এই রিপোর্টের ভিত্তিতে 1956 সালের 1 নভেম্বর ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’ পাশ হয়। এর ফলে 14টি রাজ্য ও 6টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হয়। মাদ্রাজ থেকে কেরালা, কর্ণাটক, অন্ধ্র আলাদা হয়।
ii. পরবর্তী বিভাজন: এর পরেও ভাষা আন্দোলন চলতে থাকে –
– 1960 সালে বোম্বে থেকে মহারাষ্ট্র (মারাঠি) ও গুজরাট (গুজরাটি) আলাদা হয়।
– 1966 সালে পাঞ্জাব থেকে হরিয়ানা (হিন্দি) ও হিমাচল আলাদা হয় এবং পাঞ্জাব পাঞ্জাবি ভাষীদের রাজ্য হয়।
– পরে 2000 সালে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড এবং 2014 সালে তেলেঙ্গানা গঠিত হয়।
iii. সুফল ও কুফল: ভাষা ভিত্তিক রাজ্য গঠনের ফলে আঞ্চলিক ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ হয়, প্রশাসন মানুষের কাছে পৌঁছায়, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু এর কুফল হিসাবে আঞ্চলিকতাবাদ, ভাষা দাঙ্গা (যেমন 1960-এ আসামে বাংলা-অসমীয়া দাঙ্গা), বিচ্ছিন্নতাবাদও বাড়ে।

উপসংহার: ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন ছিল ভারতের গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক সাহসী পরীক্ষা, যা ভারতকে ভেঙে দেয়নি, বরং ঐক্যবদ্ধ ভারতে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

—   ➣Read More


Discover more from NIRYAS.IN

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page

Discover more from NIRYAS.IN

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading