Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha-ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরাধীন ভারতে বৈষম্য, অভাব ও আধুনিক গবেষণার সুযোগহীনতার মধ্য থেকেও যে বাঙালি বিজ্ঞানীরা বিশ্ববিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তিন উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন—জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা। চরম প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে, মেধা ও দৃঢ়তার কাছে কোনো বাধাই বড় নয়। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব এই তিন ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানীর জীবন, সংগ্রাম ও অমর কীর্তি সম্পর্কে।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha

ভারত ও বাংলার বিজ্ঞানী: জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা
ভূমিকা: ঔপনিবেশিক ভারতে বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ
উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের প্রথম দিকের ভারত ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। এই সময়ে ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, লাইব্রেরি, আন্তর্জাতিক জার্নালের সহজলভ্যতা, গবেষণার জন্য অর্থ, এসবের প্রায় কিছুই ছিল না। ব্রিটিশ সরকারের নীতি ছিল ভারতকে কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং বাজার হিসেবে রাখা, এখানে উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা গড়ে তোলা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তখনকার প্রধান শিক্ষা কেন্দ্র। প্রেসিডেন্সি কলেজে কিছু ইউরোপীয় অধ্যাপক ছিলেন, কিন্তু ভারতীয়দের জন্য গবেষণার সুযোগ ছিল সীমিত। একজন ভারতীয় বিজ্ঞানীকে প্রায়ই নিজের বেতনের টাকা দিয়ে যন্ত্র কিনতে হতো, নিজের হাতে যন্ত্র বানাতে হতো, এবং বিদেশি জার্নালে গবেষণাপত্র পাঠাতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো।
এই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই তিনজন বাঙালি বিজ্ঞানী বিশ্ববিজ্ঞানে এমন অবদান রাখেন, যা আজও পড়ানো হয়। তাঁরা হলেন জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা। তাঁদের জীবন এবং কাজ একই সূত্রে গাঁথা। জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন তাঁদের এক প্রজন্ম আগের। সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা ছিলেন সহপাঠী এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকর্মী। এই তিনজনের গল্প আলাদা করে বোঝা যায় না, কারণ তাঁরা একই পরিবেশ থেকে উঠে এসেছিলেন এবং একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
এই প্রবন্ধে আমরা এই তিনজনের জীবন, শিক্ষা, গবেষণা, সংগ্রাম এবং উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। শুধু তাঁদের আবিষ্কারের নয়, আমরা দেখব কীভাবে তাঁরা কাজ করতেন, কীভাবে বাধা পেরিয়েছিলেন এবং কেন তাঁদের কাজ আজও গুরুত্বপূর্ণ।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
জগদীশ চন্দ্র বসু: যিনি প্রমাণ করলেন উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে
জন্ম, পরিবার এবং প্রাথমিক শিক্ষা
জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই জায়গা বাংলাদেশের অন্তর্গত। তাঁর বাবা ভগবান চন্দ্র বসু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বাবার বদলির চাকরির কারণে জগদীশকে ছোটবেলায় বাংলা গ্রামে থাকতে হয়েছিল। এই সময়ে তিনি গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন। পুকুর, গাছপালা, পাখি, মাটি, এই সবই ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।
তাঁর বাবা চাইতেন না ছেলে শুধু ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তাই তাঁকে প্রথমে একটি বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা হয়। পরে তিনি কলকাতায় আসেন এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন। এখানে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরে। এই কলেজে তাঁর শিক্ষক ছিলেন ফাদার ইউজিন লাফোঁ, যিনি ছিলেন একজন ফরাসি জেসুইট পাদরি এবং বিজ্ঞানী। লাফোঁ তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞান শেখাতেন। বই পড়ে মুখস্থ করার বদলে, যন্ত্র দিয়ে নিজে পরীক্ষা করে দেখার অভ্যাস তিনি এখান থেকেই পান।
কেমব্রিজে পড়াশোনা এবং ডিএসসি
জগদীশ চন্দ্র বসু উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যান। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্টস কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান পড়েন। কেমব্রিজে থাকার সময় তিনি তৎকালীন বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের বক্তৃতা শোনেন এবং আধুনিক গবেষণার পদ্ধতি শেখেন।
কেমব্রিজ থেকে ফিরে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তখন কোনো ভারতীয়ের পক্ষে এই ডিগ্রি পাওয়া ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এই ডিগ্রি তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের যোগ্যতা দেয়।
প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক জীবন এবং বেতন বৈষম্য
১৮৮৫ সালে জগদীশ চন্দ্র বসু কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু যোগ দেওয়ার পরই তিনি একটি বড় বৈষম্যের শিকার হন। তাঁর ইউরোপীয় সহকর্মীদের তুলনায় তাঁর বেতন ছিল প্রায় অর্ধেক। তিনি এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করেন এবং প্রায় তিন বছর ধরে অতিরিক্ত বেতন না নিয়েই কাজ করেন। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তাঁর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
প্রেসিডেন্সি কলেজে তখন গবেষণার কোনো সুবিধা ছিল না। ল্যাবরেটরিতে ভালো যন্ত্র ছিল না। জগদীশ চন্দ্র বসু নিজের টাকা দিয়ে যন্ত্রপাতি কিনতেন এবং নিজের হাতে অনেক যন্ত্র বানাতেন। তাঁর সহকারী ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, কিন্তু তাও সব কাজ হাতে করতে হতো। এই অবস্থাতেই তিনি এমন গবেষণা করলেন, যা বিশ্বকে চমকে দিল।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
বেতার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা: মার্কনির আগে
জগদীশ চন্দ্র বসুর প্রথম বড় গবেষণার ক্ষেত্র ছিল তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। তখন হার্টজ এই তরঙ্গ আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু তা নিয়ে গবেষণা চলছে। বসু হার্টজের চেয়ে অনেক ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্য, অর্থাৎ মাইক্রোওয়েভ নিয়ে কাজ শুরু করেন।
তিনি একটি বিশেষ যন্ত্র তৈরি করেন, যাকে তিনি কোহেরার বলেন। এই যন্ত্র দিয়ে তিনি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারতেন। ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার টাউন হলে তিনি একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেন। তিনি দূর থেকে বেতার তরঙ্গ পাঠিয়ে একটি ঘণ্টা বাজান এবং দূরে রাখা বারুদে বিস্ফোরণ ঘটান। এই পরীক্ষা দেখে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে যান।
এই পরীক্ষা হয়েছিল গুগলিয়েলমো মার্কনির বেতার টেলিগ্রাফের পেটেন্টের আগে। মার্কনি ১৮৯৬ সালে পেটেন্ট করেন। বসুর কাজ দেখে মার্কনি নিজেও তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর কোহেরার সম্পর্কে জানতে চান। বসু তাঁর আবিষ্কারের পেটেন্ট নেননি। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞানের আবিষ্কার সবার জন্য। এই কারণে তিনি বেতার আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হন, কিন্তু বিজ্ঞানীরা আজ তাঁকে বেতার বিজ্ঞানের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে স্বীকার করেন।
মাইক্রোওয়েভ নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল আরও গভীর। তিনি বিভিন্ন পদার্থ দিয়ে তরঙ্গ শোষণ, প্রতিফলন, প্রতিসরণ পরীক্ষা করেন। তিনি তরঙ্গের মেরুকরণ নিয়ে কাজ করেন। তাঁর তৈরি যন্ত্রগুলো ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং নির্ভুল। রয়্যাল সোসাইটি তাঁর কাজের প্রশংসা করে এবং তাঁকে ফেলো হিসেবে নির্বাচিত করে।
উদ্ভিদবিজ্ঞানে বিপ্লব: ক্রেসকোগ্রাফ
১৯০০ সালের পর জগদীশ চন্দ্র বসু একটি নতুন ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন, যা তখনকার বিজ্ঞানীদের কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল। তিনি উদ্ভিদের ওপর পরীক্ষা শুরু করেন। প্রশ্ন ছিল, উদ্ভিদ কি অনুভব করতে পারে? উদ্ভিদ কি আঘাত পেলে প্রতিক্রিয়া দেখায়?
তিনি একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন, যার নাম দেন ক্রেসকোগ্রাফ। এই যন্ত্র দিয়ে উদ্ভিদের বৃদ্ধি প্রতি মিনিটে মাপা যেত। যন্ত্রটি এত সূক্ষ্ম ছিল যে এক সেকেন্ডে উদ্ভিদ কতটুকু বাড়ছে, তা রেকর্ড করা যেত। এই যন্ত্র দিয়ে তিনি দেখালেন, উদ্ভিদের বৃদ্ধির হার তাপমাত্রা, আলো, আর্দ্রতা অনুযায়ী বদলায়।
এরপর তিনি আরও সূক্ষ্ম যন্ত্র তৈরি করেন, যার নাম ম্যাগনেটিক ক্রেসকোগ্রাফ। এই যন্ত্র দিয়ে তিনি উদ্ভিদের অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক প্রবাহ মাপতে পারতেন। তিনি দেখালেন, যখন উদ্ভিদের কোনো অংশে আঘাত করা হয়, গরম করা হয় বা বিষ প্রয়োগ করা হয়, তখন উদ্ভিদের মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত সৃষ্টি হয় এবং তা এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ উদ্ভিদেরও একটি স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আছে, অনেকটা প্রাণীদের মতো।
তিনি প্রমাণ করেন, উদ্ভিদও ক্লান্ত হয়, উদ্ভিদও উত্তেজনায় সাড়া দেয়, এবং বিষ প্রয়োগ করলে উদ্ভিদ মারা যায়, অনেকটা প্রাণীর মতোই। তাঁর এই গবেষণা ১৯০২ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়, যার নাম Response in the Living and Non-Living। প্রথমে অনেক বিজ্ঞানী এই দাবি মানতে চাননি। কিন্তু বারবার পরীক্ষা করে এবং অন্যান্য ল্যাবরেটরিতে একই ফল পাওয়ার পর তা স্বীকৃতি পায়।
এই আবিষ্কারের ফলে উদ্ভিদবিজ্ঞানে একটি নতুন শাখা তৈরি হয়। আজকের উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা এবং উদ্ভিদ স্নায়ুবিজ্ঞানের ভিত্তি অনেকটাই তাঁর কাজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা
১৯১৭ সালে জগদীশ চন্দ্র বসু কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি স্বাধীন কেন্দ্র তৈরি করা। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি এমন একটি লাইব্রেরি এবং ল্যাবরেটরি তৈরি করেন, যেখানে তরুণ গবেষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
তিনি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজের জমি এবং টাকা দেন। তিনি চাইতেন, ভারতীয় তরুণরা বিদেশে গিয়ে গবেষণা না শিখে, নিজের দেশেই গবেষণা করুক। বসু বিজ্ঞান মন্দির আজও কলকাতায় গবেষণা করে চলেছে।
মৃত্যু এবং স্বীকৃতি
জগদীশ চন্দ্র বসু ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর মারা যান। তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন, ফ্রান্সের বিজ্ঞান একাডেমি থেকে সম্মান পেয়েছিলেন, এবং ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইটহুড দেয়। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হলো, তাঁর আবিষ্কৃত যন্ত্র এবং তত্ত্ব আজও বিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু: যাঁর নামে কণার নামকরণ হয়েছে
জন্ম, পরিবার এবং প্রাথমিক শিক্ষা
সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা। ছোটবেলা থেকেই সত্যেন্দ্রনাথ গণিতে অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন।
তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন। এই স্কুলে তাঁর সহপাঠী ছিলেন মেঘনাদ সাহা। হেয়ার স্কুল থেকে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়েন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ।
প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকার সময় তাঁরা দুজনে মিলে একটি কাজ করেন, যা তখনকার ছাত্রদের পক্ষে অসাধারণ ছিল। তাঁরা জার্মান ভাষায় লেখা বিজ্ঞানের বই নিজেরা অনুবাদ করে বাংলায় প্রকাশ করেন। তখন জার্মান ভাষা ছিল বিজ্ঞানের প্রধান ভাষা। এই অনুবাদের কাজ তাঁদের জার্মান বিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত করায়।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ গড়ে তোলার জন্য ভালো অধ্যাপক দরকার ছিল। সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ল্যাবরেটরির অবস্থা খুব খারাপ ছিল। টাকা ছিল না, যন্ত্র ছিল না, বই ছিল না। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা এই অবস্থাতেই গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা রাতে বসে তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন, দিনে ছাত্রদের পড়াতেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্ব, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং পরিসংখ্যান নিয়ে গভীর কাজ করেন। তিনি ছাত্রদের জন্য এই জটিল বিষয়গুলো সহজ করে বোঝাতেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
১৯২৪ সালের ঐতিহাসিক গবেষণাপত্র
সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সবচেয়ে বড় কাজ হয় ১৯২৪ সালে। তখন পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম তত্ত্ব নতুন নতুন আকার নিচ্ছে। আলোর প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। ম্যাক্স প্ল্যাংক বলেছেন, আলো কোয়ান্টা বা প্যাকেট আকারে নির্গত হয়। আইনস্টাইন বলেছেন, আলো ফোটন নামে কণা দিয়ে তৈরি। কিন্তু ফোটনের পরিসংখ্যান কী হবে, তা তখনও স্পষ্ট ছিল না।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু এই সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। তিনি প্ল্যাংকের সূত্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখান, যদি ফোটনগুলোকে আলাদা করা যায় না, অর্থাৎ তারা অভিন্ন কণা হিসেবে গণনা করা হয়, তাহলে প্ল্যাংকের সূত্র সরাসরি পাওয়া যায়, কোনো অতিরিক্ত অনুমান ছাড়াই।
তিনি একটি গবেষণাপত্র লেখেন এবং তা বিখ্যাত জার্নাল ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে পাঠান। কিন্তু জার্নালের সম্পাদক গবেষণাপত্রটি ফিরিয়ে দেন। তাঁরা তখন তরুণ ভারতীয় বিজ্ঞানীর কাজকে গুরুত্ব দেননি।
বসু হতাশ হননি। তিনি গবেষণাপত্রটি সরাসরি আলবার্ট আইনস্টাইনকে পাঠান। তিনি আইনস্টাইনকে চিঠিতে লেখেন, তিনি একজন ভারতীয় অধ্যাপক এবং তাঁর কাজটি যদি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তাহলে যেন আইনস্টাইন তা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।
আইনস্টাইন গবেষণাপত্রটি পড়ে সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন। তিনি নিজে গবেষণাপত্রটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন এবং জার্মানির বিখ্যাত জার্নাল Zeitschrift für Physik-এ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ১৯২৪ সালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এই গবেষণাপত্রে বসুর নাম প্রথম লেখক হিসেবে থাকে, এবং আইনস্টাইন সহ-লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান এবং বোসন
বসুর এই গবেষণাপত্র থেকে যে পরিসংখ্যান তৈরি হয়, তাকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান। এই পরিসংখ্যান মেনে চলে যে কণাগুলো, তাদের নাম দেওয়া হয় বোসন। ফোটন হলো একটি বোসন। পরে আরও অনেক কণা আবিষ্কৃত হয়, যারা এই পরিসংখ্যান মানে, যেমন গ্লুয়ন, গ্র্যাভিটন, এবং ২০১২ সালে আবিষ্কৃত হিগস বোসন।
এই কারণে আজ পদার্থবিজ্ঞানে বোসন নামটি ব্যবহৃত হয়। একজন ভারতীয় বিজ্ঞানীর নামে একটি মৌলিক কণার শ্রেণীর নামকরণ, এটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
১৯২৪-২৫ সালে আইনস্টাইন বসুর কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি দেখান, যদি কোনো গ্যাসের পরমাণুগুলোকে অত্যন্ত ঠান্ডা করা যায়, তাহলে তারা সবাই একই কোয়ান্টাম অবস্থায় চলে যাবে। এই অবস্থাকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট। এই ভবিষ্যদ্বাণী ১৯৯৫ সালে পরীক্ষাগারে প্রথম তৈরি করা সম্ভব হয়, যার জন্য তিন বিজ্ঞানী নোবেল পান।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
কলকাতায় ফিরে আসা এবং পরবর্তী কাজ
১৯২৬ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি, কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা এবং গণিত নিয়ে কাজ করেন।
তিনি শুধু গবেষণায় নয়, বিজ্ঞান শিক্ষায়ও গুরুত্ব দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানকে মাতৃভাষায় শেখানো উচিত। তিনি বাংলায় বিজ্ঞানের বই লেখেন এবং অনুবাদ করেন। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তিনি নোবেল পাননি, কিন্তু তাঁর নামে নামকরণ করা বোসন কণার আবিষ্কারের পর তাঁর কাজের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
মেঘনাদ সাহা: যাঁর সমীকরণ দিয়ে তারার তাপমাত্রা মাপা হয়
জন্ম, পরিবার এবং প্রাথমিক শিক্ষা
মেঘনাদ সাহা ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের শেওড়াতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই জায়গা বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলার অন্তর্গত। তাঁর বাবা জগন্নাথ সাহা ছিলেন একজন মুদি দোকানদার। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ।
ছোটবেলায় মেঘনাদকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তিনি খালি পায়ে স্কুলে যেতেন, বইয়ের অভাবে অনেক কষ্টে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় আসেন।
তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়। দুজনে মিলে বিজ্ঞানের জার্মান বই অনুবাদ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ এবং তাত্ত্বিক গবেষণা
১৯১৬ সালে মেঘনাদ সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কাজ করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে মিলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা পরিবেশ তৈরি করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার মতো কোনো টেলিস্কোপ ছিল না। কিন্তু সাহা তাত্ত্বিকভাবে কাজ করতেন। তিনি সূর্যের বর্ণালী, তারার বর্ণালী এবং পরমাণুর গঠন নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বুঝতে পারেন, তারার বর্ণালীর রেখাগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য তাপীয় আয়নীকরণের তত্ত্ব দরকার।
১৯২০ সালের সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ
মেঘনাদ সাহার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হয় ১৯২০ সালে। তিনি তখন লন্ডনে ছিলেন এবং ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রে তিনি একটি সমীকরণ দেন, যা দিয়ে বের করা যায়, কোনো গ্যাসকে কত তাপমাত্রায় গরম করলে তার পরমাণুগুলো আয়নিত হবে।
আয়নীকরণ মানে হলো, পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে যাওয়া। সূর্য এবং অন্যান্য তারার ভেতরে এবং বাইরের স্তরে তাপমাত্রা এত বেশি যে সেখানকার পরমাণুগুলো আয়নিত অবস্থায় থাকে। কিন্তু কোন তাপমাত্রায় কোন মৌলের কতটুকু আয়নীকরণ হবে, তা বের করা ছিল একটি বড় সমস্যা।
সাহা যে সমীকরণ দেন, তা হলো:
n_{i+1} / n_i = (2π m_e k T / h^2)^{3/2} _ (2 g_{i+1} / g_i) _ e^{-χ_i / k T} / N_e
এই সমীকরণে তাপমাত্রা T, ইলেকট্রনের ঘনত্ব N_e, এবং আয়নীকরণ শক্তি χ_i ব্যবহার করে আয়নীকরণের অনুপাত বের করা যায়। এই সমীকরণ আজও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়। একে সংক্ষেপে সাহা সমীকরণ বলা হয়।
এই সমীকরণের সবচেয়ে বড় প্রয়োগ হয় তারার বর্ণালী ব্যাখ্যায়। তারার বর্ণালীতে বিভিন্ন মৌলের শোষণ রেখা দেখা যায়। কোন রেখা কত তীব্র হবে, তা নির্ভর করে তারার তাপমাত্রার ওপর। সাহার সমীকরণ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা তারার তাপমাত্রা মাপতে পারলেন এবং তারায় কোন মৌল কত পরিমাণে আছে, তা বের করতে পারলেন। এর ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে কেমিস্ট্রি আলাদা হয়ে একটি নতুন বিজ্ঞান তৈরি হয়, যার নাম অ্যাস্ট্রোফিজিক্স।
সাহা নিজে এই সমীকরণ দিয়ে সূর্যের বর্ণালী ব্যাখ্যা করেন এবং দেখান, সূর্যের বাইরের স্তরে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং অন্যান্য মৌল কী অবস্থায় আছে।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
বিজ্ঞান পরিকল্পনা এবং জনসেবা
মেঘনাদ সাহা শুধু গবেষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞান পরিকল্পনাবিদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীন ভারতের উন্নতির জন্য বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৪৭ সালে, তিনি ভারতের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেন। তিনি নদী পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং শিল্পায়নের জন্য বিজ্ঞানের ব্যবহার নিয়ে কাজ করেন। তিনি দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্যও অনেক কাজ করেন। তিনি বাংলায় বিজ্ঞানের বই লেখেন, পত্রিকায় বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান শুধু ল্যাবরেটরিতে থাকা উচিত নয়, তা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত।
তিনি কলকাতায় ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করেন।
মেঘনাদ সাহা ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তিনি নোবেল পাননি, কিন্তু তাঁর সমীকরণ আজও প্রতিটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাঠ্যবইতে পড়ানো হয়।
তিনজনের মধ্যে সম্পর্ক এবং যৌথ উত্তরাধিকার
এই তিনজন বিজ্ঞানীর জীবনে একটি সুন্দর যোগসূত্র আছে। জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহার এক প্রজন্ম আগের। তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, সেই পথ ধরে তাঁরা এগিয়েছেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহকর্মী। তাঁরা দুজনেই হেয়ার স্কুল এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। দুজনে মিলে জার্মান বিজ্ঞানের বই অনুবাদ করেছেন। ১৯১৬ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত তাঁরা দুজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে কাজ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা যে গবেষণা পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, তা ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি স্বর্ণযুগ হিসেবে মনে করা হয়। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে এমন আলোচনা হতো, যা কেমব্রিজ বা গটিংগেনের মতো জায়গায় হতো। তরুণ ছাত্ররা কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতা নিয়ে আলোচনা করতেন, যা তখন বিশ্বে সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব ছিল।
জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা, এই তিনজনই প্রমাণ করেছেন, ভারতীয় বিজ্ঞানীরা শুধু অনুকরণ করতে পারেন না, তাঁরা মৌলিক আবিষ্কার করতে পারেন। তাঁদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আজ:
- জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির আছে।
- সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে বোসন কণার নামকরণ হয়েছে এবং বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট নিয়ে গবেষণা চলছে।
- মেঘনাদ সাহার নামে সাহা সমীকরণ এবং সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স আছে।
ঔপনিবেশিক বাধা এবং তাঁদের সংগ্রাম
এই তিনজনের জীবনে একটি সাধারণ বিষয় ছিল, তাঁরা সবাই ঔপনিবেশিক বাধার শিকার হয়েছিলেন।
- জগদীশ চন্দ্র বসুকে তাঁর ইউরোপীয় সহকর্মীদের চেয়ে কম বেতন দেওয়া হয়েছিল। তাঁর গবেষণার জন্য তাঁকে নিজের টাকা খরচ করতে হয়েছিল। তাঁর উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণাকে প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
- সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গবেষণাপত্র প্রথমে পাশ্চাত্য জার্নাল প্রত্যাখ্যান করেছিল। শুধুমাত্র আইনস্টাইনের সুপারিশে তা প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি নোবেল পাননি, যদিও তাঁর কাজ নোবেল-যোগ্য ছিল।
- মেঘনাদ সাহা দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাধারণ দোকানদার। তাঁকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। তাঁর সমীকরণ প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেননি। পরে এর গুরুত্ব বোঝা গেছে।
এই সংগ্রামগুলো আমাদের শেখায়, বিজ্ঞান শুধু মেধার নয়, ধৈর্য এবং দৃঢ়তারও। এই তিনজন যদি হাল ছেড়ে দিতেন, তাহলে বিজ্ঞানের ইতিহাস অন্যরকম হতো।
উপসংহার: আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহার জীবন থেকে আমরা অনেক শিক্ষা পাই।
প্রথম শিক্ষা হলো, মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা যায় এবং করা উচিত। এই তিনজনই বাংলায় বিজ্ঞান লেখালেখি করেছেন এবং বাংলায় বিজ্ঞান শেখানোর পক্ষে ছিলেন।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, প্রতিকূল পরিবেশেও মৌলিক গবেষণা করা সম্ভব। তাঁদের কাছে আধুনিক ল্যাব ছিল না, টাকা ছিল না, কিন্তু তাঁদের কাছে ছিল প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তর খোঁজার ধৈর্য।
তৃতীয় শিক্ষা হলো, বিজ্ঞান একা একা হয় না। জগদীশ চন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহা একসঙ্গে কাজ করেছেন, একে অপরের কাজের সমালোচনা করেছেন এবং উন্নতি করেছেন।
চতুর্থ শিক্ষা হলো, স্বীকৃতি না পেলেও কাজের মূল্য কমে না। এই তিনজনের মধ্যে কেউই নোবেল পাননি, কিন্তু তাঁদের কাজ আজও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। বোসন কণা, সাহা সমীকরণ এবং বসুর ক্রেসকোগ্রাফ আজও বিজ্ঞানের অংশ।
আজকের ভারত এবং বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য এই তিনজনের জীবন একটি দিশা। তাঁরা দেখিয়েছেন, গ্রাম থেকে, দারিদ্র্য থেকে, ঔপনিবেশিক বাধা পেরিয়েও বিশ্ববিজ্ঞানে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। দরকার শুধু কৌতূহল, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম।
Scientists of India and Bengal – J Bose, S Bose, M Saha
সারসংক্ষেপ
জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৯৫ সালে বেতার তরঙ্গ নিয়ে অগ্রগামী গবেষণা করেন এবং পরে ক্রেসকোগ্রাফ আবিষ্কার করে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদেরও বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আছে। তিনি ১৯১৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯২৪ সালে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান দেন, যার ভিত্তিতে বোসন কণার নামকরণ হয় এবং বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেটের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়। মেঘনাদ সাহা ১৯২০ সালে সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ দেন, যা দিয়ে তারার তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা হয় এবং অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ভিত্তি তৈরি হয়। এই তিনজন ঔপনিবেশিক ভারতের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও বিশ্ববিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রাখেন এবং ভারতীয় বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁদের জীবন আজকের তরুণদের জন্য কৌতূহল, ধৈর্য এবং স্বদেশপ্রেমের উদাহরণ হয়ে আছে।
তথ্যসূত্র
- Bose, J. C. (1902). Response in the Living and Non-Living. Longmans, Green and Co., London.
- Bose, J. C. (1896). On a New Electro-Polariscope. Proceedings of the Royal Society, 60, 167-172.
- Bose, S. N. (1924). Plancks Gesetz und die Lichtquantenhypothese. Zeitschrift für Physik, 26(1), 178-181.
- Einstein, A. (1924). Quantentheorie des einatomigen idealen Gases. Sitzungsberichte der Preussischen Akademie der Wissenschaften, 1924, 261-267.
- Saha, M. N. (1920). Ionization in the Solar Chromosphere. Philosophical Magazine, 40(6), 472-488.
- Saha, M. N. (1921). On the Harvard Classification of Stellar Spectra. Proceedings of the Royal Society A, 99(697), 135-153.
- Indian National Science Academy. Biographical Memoirs of Fellows: J. C. Bose, S. N. Bose, M. N. Saha. New Delhi.
- Basu, S. (1999). Meghnad Saha: The Man and His Science. Kolkata: Saha Institute of Nuclear Physics.
- Sen, A. (2000). Satyendra Nath Bose: A Profile. Kolkata: S. N. Bose National Centre for Basic Sciences.
- Mukherjee, P. (2014). Jagadis Chandra Bose: The Man and His Work. Kolkata: Bose Institute. ➣Read in English
📌 এক ক্লিকেই সব বিষয়ের সেরা প্রস্তুতি!
আপনার প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে Niryas.in-এ যুক্ত করা হয়েছে Academic, WBPSC, SSC, CTET, Static GK, মক টেস্ট ও ফ্রি PDF নোটস। এক জায়গা থেকেই সমস্ত বিষয়ের গাইড পেতে নিচের লিঙ্কে টাচ করুন
👇🏻
➣Niryas Online Preparation Portal – এক নজরে সমস্ত কিছু গাইড দেখতে ক্লিক/টাচ করুন
👇🏻
Competitive Exam Preparation | Study Materials & Practice Set
এক ছাতার তলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে আজই যুক্ত হন:
👇🏻
➣মাধ্যমিক 2027 – সব বিষয়ের মডেল প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র পড়তে ক্লিক/টাচ করুন
➣দেখুন : SLST Geography Mega Preparation
➣দেখুন: আপার প্রাইমারি TET পরীক্ষা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
➣পড়ুন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী’র গল্প
➣দেখুন : অঙ্গনওয়াড়ি পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
➣দেখুন : গ্রাম পঞ্চায়েত পরীক্ষা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
➣দেখুন : WBP পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
➣দেখুন : ANM & GNM পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
Mystery of
Disappearance – Some Unsolved Questions
➣দেখুন : WB KP পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
➣ দেখুন : প্রাথমিক TET পরীক্ষার মহা প্রস্তুতি
➣পড়ুন : কুইজ ক্যাপসুল নির্যাস
➣দেখুন: WB SCC Group C & D পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি
➣দেখুন : WBPSC Clerkship পরীক্ষার সম্পূর্ণ পরিস্থিতি
➣দেখুন : SLST Life science Preparation
➣দেখুন : SLST Bengali Preparation
➣দেখুন : SLST English Preparation
➣দেখুন : SLST History Preparation
➣দেখুন : SLST Sanskrit Preparation
➣দেখুন : SLST Education Preparation
➣দেখুন : SLST Philosophy Preparation
➣দেখুন : SLST Political Science Preparation
Discover more from NIRYAS.IN
Subscribe to get the latest posts sent to your email.